সোমবার (১৪ ডিসেম্বর) আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় আবেদন দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন।
অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন জানান, সোমবার মোট চার জনের খালাসের বিরুদ্ধে আপিল করেছি। যারা হাইকোর্টে খালাস পেয়েছেন এবং যাদের সাজা হাইকোর্ট কমিয়ে দিয়েছেন, তাদের সবার ক্ষেত্রেই আপিল দায়ের করা হবে।
তিনি আরও জানান, প্রায় ৫৩ হাজার পৃষ্ঠার একটি পিটিশন দায়ের করা হয়েছে। ৫৩ হাজার পৃষ্ঠা করে এভাবে আরও ১০টি পিটিশন দায়ের করা হবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এত বেশি কাগজ ব্যবহার করে আগে কখনও আপিল করা হয়নি। তাই এটা সময় সাপেক্ষ হওয়ায় আমাদের কিছু সময় লেগেছে। তবে এর পাশাপাশি আরও কিছু সংযুক্তি পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে অব্যাহতি চেয়ে আমরা আদালতে আবেদন জানাবো। এরপর খুব দ্রুত আমরা আপিলের শুনানি শুরু করতে পারবো বলে আশা রাখছি।
এর আগে ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টার পরপরই পিলখানায় বিডিআর সদর দফতরে গুলির শব্দ পাওয়া যেতে থাকে। বিডিআর সপ্তাহ চলার কারণে প্রথমে অনেকেই ভেবেছিলেন, কোনও কর্মসূচি চলছে। কিন্তু কিছু সময় পর জানা যায়— বিদ্রোহ হয়েছে। পিলখানার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে জওয়ানরা।
বিদ্রোহের পর সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে বসেন। এরই মধ্যে পিলখানার চার দিকে সেনাবাহিনী ভারী অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেয়।
এক পর্যায়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্রোহীদের সঙ্গে শুরু হয় আলোচনা। তৎকালীন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, হুইপ মীর্জা আজম ও সাংসদ ফজলে নূর তাপস এ আলোচনার নেতৃত্ব দেন।
বিকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও বিদ্রোহীদের আলোচনা হয়। পরে পিলখানার প্রধান ফটকের পাশের একটি রেস্তোরাঁয় আলোচনায় অংশ নেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন।
গভীর রাতে তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন পিলখানায় গেলে বিদ্রোহীরা তার কাছে অস্ত্র সমর্পণ করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেরিয়ে আসার সময় বিদ্রোহীদের হাতে জিম্মি কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা এবং তাদের পরিবারকে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। তারা মুক্ত হন।
কিন্তু এরপরও পিলখানা বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকতে দেখা যায়। এক পর্যায়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকাল থেকে পিলখানা শূন্য হয়ে পড়লে পুলিশ ও সেনাবাহিনী পিলখানার নিয়ন্ত্রণ নেয়। অবসান ঘটে প্রায় ৩৩ ঘণ্টার বিদ্রোহের।
সেই বিদ্রোহ অবসানের পরদিন পিলখানায় পাওয়া যায় একাধিক গণকবর। সেখানে পাওয়া যায় বিডিআরের তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ, তার স্ত্রীসহ সেনা কর্মকর্তাদের লাশ।
রক্তাক্ত ওই বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পুনর্গঠন করা হয়। নাম বদলের পর এ বাহিনী এখন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) হিসেবে পরিচিত।
পরে এ মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষে ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. আখতারুজ্জামান বকশীবাজারস্থ আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী এজলাসে রায় ঘোষণা করা হয়। পিলখানা বিদ্রোহের ঘটনায় সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যার দায়ে ১৫২ আসামির ফাঁসির রায় দেন এই বিচারক। এসময় তিনি বলেন, ‘দেশের সামরিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ধ্বংস করার উদ্দেশ্য নিয়ে পিলখানায় সেই বিদ্রোহ ঘটানো হয়েছিল।’ ন্যায্যমূল্যে পণ্যবিক্রির মতো কাজে বিডিআরকে জড়ানো ঠিক হয়নি বলেও রায়ের পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন তিনি।
এরপর ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও জেল আপিলের শুনানি হয়। পরে ২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর টানা দুই দিনে পিলখানা হত্যকাণ্ডের মামলায় হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করেন।
হাইকোর্টের রায়ে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ১৫২ আসামির মধ্যে ১৩৯ জনের ফাঁসির রায় বহাল রাখা হয়। একইসঙ্গে ৮ জনের মৃত্যুদণ্ড সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন ও চার জনকে খালাস দেওয়া হয়। অন্যদিকে এ মামলার অন্যতম আসামি বিএনপি নেতা নাসিরউদ্দিন পিন্টু হাইকোর্টের বিচার চলাকালীন সময়ে মারা যান।
পাশাপাশি বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন পাওয়া ১৬০ জন আসামির মধ্যে ১৪৬ জনের সাজা বহাল রাখেন হাইকোর্ট। এদের মধ্যে দুই আসামির মৃত্যু এবং ১২ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।
এছাড়াও জজ আদালতে খালাস পাওয়া ৬৯ আসামির মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে ৩১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে এ মামলায় ৪ জনকে সাত বছরের কারাদণ্ড এবং ৩৪ জনকে খালাসের বিচারিক আদালতের রায় বহাল রেখেছিলেন হাইকোর্ট।
চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশিত হয়।