সৌদি আরবে আবিরন হত্যা, তিন অভিযুক্তের জামিন নামঞ্জুর 

সৌদি আরবে বাংলাদেশি গৃহকর্মী আবিরন হত্যা মামলায় গ্রেফতার তিন আসামির কাউকে জামিন দেয়নি দেশটির আদালত। আদালত এ ব্যাপারে আসামিদের লিখিত জবাব দিতে বলেছেন। বুধবার (৬ জানুয়ারি) এই মামলার সর্বশেষ শুনানি ছিল। আদালত আগামী ২০ জানুয়ারি মামলার পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেছে।

আবিরনের পরিবারকে উদ্ধৃত করে এসব তথ্য জানিয়েছেন ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচি প্রধান শরিফুল হাসান। তিনি বলেন, আবিরনের পরিবার বলেছে তারা এই ঘটনায় কোনও সমঝোতা নয়, বরং জানের বদলে জান (কিসাস) চান। তারা চান আর কোনও আবিরন যেন এভাবে মারা না যায়। 

সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সকালে রিয়াদের ক্রিমিনাল কোর্টের ৬ নম্বর আদালতে মামলার শুনানি শুরু হয়। আবিরনের পরিবারের পক্ষ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়ে রিয়াদে দূতাবাসের প্রথম সচিব সফিকুল ইসলাম ও অনুবাদক সোহেল আহমেদ শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন। শুনানিতে সৌদি আরবের পাবলিক প্রসিকিউশনের প্রতিনিধি আবদুল্লাহ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া এই হত্যার ঘটনায় আটক তিন সৌদি নাগরিক আবিরনের গৃহকর্তা বাসেম সালেম, তার স্ত্রী আয়েশা আল জিজানি এবং এই দম্পতির ছেলে ওয়ালিদ বাসেম সালেম আইনজীবীসহ কারাগার থেকে ভার্চুয়ালি উপস্থিত ছিলেন। 

শুনানির শুরুতে আদালত দূতাবাস প্রতিনিধির কাছে মৃতের ওয়ারিশের পাঠানো পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ও রাষ্টদূত কর্তৃক অথারাইজেশন চিঠি আনা হয়েছে কিনা জানতে চান। দূতাবাস পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ও অথারেইশেজন চিঠি আদালতে দেন। আদালত সেগুলো যাচাই করে সৌদি বিচার মন্ত্রণালয়ের সিস্টেমে আপডেট করেন। এরপর শুনানি শুরু হয়। 

প্রসঙ্গত, খুলনার পাইকগাছার  আবিরন স্থানীয় দালাল রবিউল ও ঢাকার একটি রিক্রটিং এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন ২০১৭ সালে। ২০১৯ সালের ২৪ মার্চ তাকে হত্যা করা হয়। দীর্ঘদিনেও পরিবারটি লাশ পাচ্ছিল না। এরপর পরিবারটি বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির সহায়তায় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোর তার লাশ দেশে আনা হয়। লাশের সঙ্গে থাকা আবিরনের মৃত্যুসনদে মৃত্যুর কারণের জায়গায় লেখা ছিল মার্ডার (হত্যা)।

লাশ যেদিন আসে ওই দিন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন স্বতঃপ্রণোদিত (সুয়োমোটো) হয়ে একটি তথ্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করে। কমিশনের অবৈতনিক সদস্য নমিতা হালদারকে এই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি ২৫ নভেম্বর খুলনার পাইকগাছা উপজেলার রামনগর গ্রামে আবিরনের বাবা আনছার সরদারের বাড়ি সরেজমিন পরিদর্শন করে, এজেন্সি, মন্ত্রলালয়, দূতাবাসসহ সবার সঙ্গে কথা বলে ওই বছরের ১৫ ডিসেম্বর বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেন। 

পরিবারের অভিযোগ, আবিরন যে বাসায় কাজ করতেন, সেখানে মোট আট জন পুরুষ থাকতেন। তারা আবিরনকে যৌন নির্যাতনও করতেন। খাবার খেতে না দেওয়া, গ্রিলে মাথা ঠুকে দেওয়াসহ নানা নির্যাতন তো ছিলই। কমিশনে প্রতিবেদনে বলা হয়, ৪০ বছরের বেশি বয়সী আবিরনকে পিটিয়ে, গরম পানিতে ঝলসে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে তাকে খুন করা হয়। সাত মাস সেখানকার এক মর্গে ছিল আবিরনের লাশ। 

আবিরনকে হত্যার ঘটনায় দালাল রবিউলকে প্রধান আসামি করে ২০১২ সালের মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনেও দেশেও একটি মামলা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে খুলনার সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পাশাপাশি এই হত্যাকাণ্ডের জন্য ক্ষতিপূরণ আদায় এবং অভিযুক্ত নির্যাতনকারীদের আদালতের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করে মানবাধিকার কমিশন। এরপর আবিরনের পরিবারের পক্ষ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়ে গত ১৬ ডিসেম্বর থেকে বিচার শুরু হয়। সৌদি আরবে বাংলাদেশি কোন গৃহকর্মী হত্যার ঘটনায় বিচারের এমন ঘটনার উদাহরণ বিরল। মামলার সর্বশেষ শুনানি ছিল বুধবার।   

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচি প্রধান শরিফুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুরু থেকেই আমরা আবিরেনর পরিবারের পাশে আছি। কারণ সৌদি আরবে বাংলাদেশি গৃহকর্মীদের উপর নির্যাতন বা হত্যার ঘটনা প্রায়ই ঘটে। কিন্তু বিচার হয় না। সেদিক থেকে আবিরণের ঘটনা ব্যতিক্রম। একটি ঘটনাতেও যদি অভিযুক্তদের শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব হয়, তখন অন্য মালিকেরা কিছুটা হলেও ভয় পাবেন। সচেতন হতে বাধ্য হবেন।