দেশে ফেসবুক গ্রুপগুলোর মধ্যে হালের আলোচিত নাম উই (উইম্যান অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম)। নারী উদ্যোক্তাদের প্ল্যাটফর্মটির সদস্যসংখ্যা ১১ লাখের বেশি। যাদের মধ্যে রয়েছেন উদ্যোক্তা, ক্রেতা সবাই। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মেও পা রাখতে চলেছে উই।
নারী উদ্যোক্তাদের তৈরি দেশীয় পণ্য ক্রেতার কাছে পৌঁছে দিতে ২০১৭ সালে প্লাটফর্মটি তৈরি করেছেন নাসিমা আক্তার নিশা। নিজে উদ্যোক্তা হয়ে যেসব বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন সেসব দূর করতেই এ উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। তিনি জানান, এখন উদ্যোক্তাদের পণ্য রফতানিতেও কাজ করে যাচ্ছে উই। সফলতাও আসতে শুরু করেছে। জানালেন, দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও ডানা মেলতে যাচ্ছে উই।
নাসিমা আক্তার জানালেন, ‘শিগগিরই ভারত ও নেপালে উইয়ের চ্যাপ্টার খোলা হবে। ২০২২ সালে সাউথ এশিয়ার দিকে যাবো। এরপর এশিয়ার বাইরে। আমরা ধীরেসুস্থে এগিয়ে যেতে চাই।’
নাসিমা আক্তার : আমি নিজে উদ্যোগ নিতে গিয়ে যে বাধাগুলো পেয়েছি, সেগুলো অতিক্রম করার জন্যই কাজ করছি। নেটওয়ার্কিংয়ের বড় সমস্যা ছিল। মনে হচ্ছিল এ নিয়ে কাজ করা উচিত। আমরা নারীরা সবই পারি। সেই ভাবনা থেকেই উই-এর জন্ম।
উই এখন শুধু একটি ফেসবুক গ্রুপ নয়। সুবিশাল নেটওয়ার্কিং প্লাটফর্ম। ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর এ গ্রুপের যাত্রা শুরু। পাশাপাশি এটি একটি রেজিস্টার্ড ট্রাস্ট। নারীদের উদ্যোক্তাদের একটি প্লাটফর্মের চিন্তা মাথায় আগে থেকেই ছিল। যখন কোনও ব্যবসায়িক উদ্যোগ নিই, তখনই পদে পদে বাধার মুখে পড়েছি। সে সবের সমাধানই উই। যেখানে নারীরা তাদের তথ্য ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারবেন। তাদের নিজেদের নেটওয়ার্কিংও হবে। মজার বিষয় হচ্ছে এখানে ক্রেতা ও বিক্রেতা দুই ধরনের নারীই আছেন। দেখা যাচ্ছে যিনি বিক্রি করছেন আবার তিনিই অন্য কিছু কিনছেন। দেশের বাইরের অনেকেও আমাদের সঙ্গে যুক্ত আছেন।
উই কিভাবে চলছে?
নাসিমা আক্তার : আপাতত আমি অ্যাডমিন। ৩৫ জনের মতো মডারেটর আছেন। সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন ১৫ জন। তবে এখন আমরা সময় ভাগাভাগি করে কাজ করছি। কারণ মডারেটররাও একেকজন উদ্যোক্তা। তাদের নিজেদের কাজেও সময় দিতে হয়। এটা মূলত ভলান্টারি কাজ। এখান থেকে কেউ কোনও আর্থিক সুবিধা পান না। তবে এখান থেকে তারা ব্র্যান্ডিং ও পরিচিতিটা পাচ্ছেন। তাদের পণ্যকে সহজে সবাই চিনতে পারছে।
উই প্রথমত একটি সামাজিক উদ্যোগ। একটা উদাহরণ দিতে পারি- আমাদের তাঁতপণ্য হারিয়েই যেতে বসেছিল। শীতলপাটিও হারিয়ে যেতে বসেছিল, কিন্তু উই-এর উদ্যোগ শুরুর পর তাঁতীরা এখন অবসরই পাচ্ছেন না। এমনকি তারা কাজও ফিরিয়ে দিচ্ছেন!
উই-এর সদস্য সংখ্যা বাড়িয়েই যাবেন? সঙ্গে আর কিছু যুক্ত হবে?
নাসিমা আক্তার : সদস্য বাড়তেই থাকবে। ইচ্ছে আছে পরবর্তী লেভেলে নিয়ে যাওয়ার। আমরা রফতানি নিয়ে কাজ করছি। সম্প্রতি আমাদের বেশ কিছু পণ্য ওমানে গেছে। অনেক বাছাই করে পাঠালাম। যাদের পণ্য, তাদের ট্রেড লাইসেন্সও ছিল না। সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে আমরা পণ্য দেশের বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছি। আরও বড় পরিকল্পনা আসছে সামনে।
নারী উদ্যোক্তারা কী ধরনের সেবা পাচ্ছেন?
নাসিমা আক্তার : প্রথমত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য শতভাগ সাপোর্ট দিই। নানা ধরনের স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম করি। করোনার এই সময়েও যেন বাসায় বসে নারীরা অলস সময় না কাটিয়ে দক্ষ হতে পারে সেজন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি। বিভিন্ন ট্রেনিং, ওয়ার্কশপের মাধ্যমে তাদের সম্ভাবনাগুলোকে যেন বের করে নিয়ে আসতে পারি, সেজন্য কাজ করছি। অনেক নারী জানতেন না কিভাবে একটা উদ্যোগ নিতে হয়। তারা এখন জানেন। ট্রেড লাইসেন্স ছাড়াও আরও অনেক কিছুর দরকার হয়। সেসবও জানা হয়েছে অনেকের। ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য কী কী করতে হয় তা নিয়েও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আমরা প্রতিনিয়ত শেখানোর চেষ্টা করছি।
এটি সামাজিক উদ্যোগ থাকবে? নাকি বিজনেস মডেলে নিয়ে যাবেন?
নাসিমা আক্তার : এখন এটি পুরোটাই সিএসআর (সামাজিক দায়বদ্ধতা) প্রোগ্রাম। নিজেরাই চালাচ্ছি। কিন্তু এটাকে বিজনেস মডেলে নিয়ে যেতে চাই। না হলে ব্যবস্থাপনার খরচ ওঠাতে পারবো না। টিম বসে যাবে। একটা সময়ে মডারেটরদের পেমেন্ট করতে হবে। অফিসে স্টাফ রাখতে হবে। সরকারের কাছ থেকে খুব অল্প পেমেন্টে ট্রেনিং নেওয়ার চেষ্টা করি। এক্সপোর্ট যখন শুরু হয়ে যাবে তখন আমরা মিনিমাম একটি সার্ভিস চার্জ যোগ করবো। সার্ভিস ফি-ই হবে সেটা, কমিশন নয়।
কিছুদিন আগে ট্রলের শিকার হয়েছিল উই
নাসিমা আক্তার : একটা জিনিস যখনই বড় হতে থাকবে, তখনই মানুষ ট্রল শুরু করবে। এটাতে অভ্যস্ত ছিলাম। কিন্তু আমাকে ও উই গ্রুপকে নিয়ে ট্রল করবে এটা ভাবিনি। যখন করেছে তখন বুঝতে পেরেছি আমরা একটু একটু করে বড় হচ্ছি। ট্রল যারা করেছেন, তাদের ধন্যবাদ, আমাকে এই রিয়েলাইজেশন দেওয়ার জন্য। ট্রল না হলে বুঝতামই না যে উই বড় হয়েছে। উদ্যোক্তা নারীদের বলি, ধৈর্য ধরুন, যারা ট্রল করছে এক সময় তারা টায়ার্ড হয়ে যাবে। কিন্তু আপনারা টায়ার্ড হবেন না। ইতোমধ্যে কিন্তু ট্রল থেমে গেছে।