সিটি করপোরেশনগুলোকে নিজস্ব অর্থায়নে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য নানামুখী কার্যক্রমের পাশাপাশি কর আদায়ে আরও বেশি ভূমিকা নিতে মেয়রদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘জনগণকে যদি সেবা নিশ্চিত করা হয়, তাহলে জনগণও কর পরিশোধ করবে। তবে এজন্য জনগণের সঙ্গে আপনাদেরকে (মেয়র) আরও বেশি সম্পৃক্ত হতে হবে।’
রবিবার (২১ মার্চ) সকালে রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ের বলরুম হলে আয়োজিত ক্যাপাসিটি ফর সিটি প্রকল্পের ‘বিয়ন্ড কোভিড ১৯: সিটি করপোরেশন ফিস্ক্যাল স্পেস’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে একথা বলেন তিনি।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, ‘উদাহরণ স্বরূপ জনগণ যদি বুঝতে পারে, তারা এক হাজার টাকা কর পরিশোধ করলে, সরকার তাদেরকে ১০ হাজার টাকার সুযোগ সুবিধা দেবে। তখন জনগণ নিজ ইচ্ছায় কর পরিশোধ করবে। কোনও জোর করার প্রয়োজন হবে না। তাই এজন্য আপনাদেরকে (মেয়র) আরও বেশি জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হবে। জনগণকে আপনারা যে সেবা দিচ্ছেন, বা দেবেন তা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে আশ্বস্ত করতে হবে। তবেই জনগণ সেবার বিনিময়ে কর পরিশোধ করবে।’
এর আগে, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী পরামর্শ চেয়ে মন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, জনগণ কর পরিশোধে আগ্রহী না। করোনা পরিস্থিতির কারণে কর পরিশোধের ক্ষেত্রে তাদের আগ্রহে আরও ঘাটতি দেখা দিয়েছে। কিন্তু তারা কর পরিশোধ না করলেও বিদ্যুতের বিল ঠিকই পরিশোধ করছে। কারণ, তারা জানে বিল পরিশোধ না করলে পরের দিন তাদের সংযোগ কেটে দেওয়া হবে। অথচ এই একইভাবে আমরা কিন্তু জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারি না। যদিও আইনে আছে কর পরিশোধ না করলে তাদের সম্পত্তি নিলাম করে কর আদায় করার কথা। কিন্তু কার বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেবো। যার বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেবো তিনি তো আমারই জনগণ। আমাদেরই নাগরিক। এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী হতে পারে কর আদায়ে?
মেয়র আইভীর এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, ‘সমস্যা আমাদের অনেক। কিন্তু সকলের অংশগ্রহণ থাকলে কোনও সমস্যা সমাধান অসম্ভব নয়। জনগণের অংশগ্রহণ থাকলে তা সমাধান সম্ভব। এজন্য আমাদেরকে আরও বেশি সেবার প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘প্রতিটি পরামর্শ আমি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে থাকি। আপনারা হয়তো জানেন, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়ররা আমাকে যখন বলেছিলেন— ঢাকার খালগুলো ওয়াসা থেকে তাদের কাছে দেওয়ার জন্য। যখন এ প্রস্তাব করা করেছিল, তখন থেকে আমি স্টাডি করেছি। আমি দেখলাম, তাদের প্রস্তাব যৌক্তিক। তাই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, খালগুলো সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করেছি। সেই সঙ্গে খালের রক্ষণাবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধানের জন্য তাদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে করে মেয়ররা দেখলেন খাল নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জ। যা তারা এখন মোকাবিলা করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।’
মন্ত্রী বলেন, ‘খালগুলো ওয়াসা থেকে সিটি করপোরেশনে হস্তান্তর করার মানে এই নয় যে, ওয়াসা ব্যর্থ হয়েছে। বরং বলতে হয়, ওয়াসা আগের চেয়ে সফল। আগে ঢাকার ৬০ ভাগ মানুষ পানি পেতো না। কিন্তু এখন শতভাগ নাগরিক পানির সুবিধা পাচ্ছে। শুধু তাই নয়, চট্টগ্রামে ২০০২ সালের দিকে আমরা দেখেছি, পানির সংযোগ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আজ সেগুলো সচল। তাই আমি বলবো তারা সফল।’
এর আগে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমি যখন দায়িত্ব নিয়েছিলাম তখন ফান্ড ছিল ৫০ কোটি টাকামাত্র। কিন্তু জাইকার অব্যাহত সহযোগিতায় আমরা করোনাকালীন ৬ মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) ১০০ কোটি টাকা কর আদায় করতে সক্ষম হয়েছি। এ বছর আমরা আরও বেশি আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করছি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা আরও সক্ষমতা অর্জন করতে চাই। কিন্তু আমাদের সে ধরনের স্পেস নেই। তাই আমরা চাই, আমাদের করপোরেশন এরিয়ায় পরিকল্পিত উন্নয়ন। এজন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং মার্কেট স্থাপন করতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে যদি হাসপাতাল থাকে, তাহলে কোনও রোগীকে দূরে যেতে হবে না। কারণ, আক্রান্ত রোগী দূরে গেলে তার কাছ থেকে জীবাণু আরও বেশি ছড়াবে। একইভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি, একটা ছোট ভবনে স্কুল খুলে প্রতিষ্ঠান চলছে। যেখানে শিশুদের জন্য খেলাধুলাসহ কোনও কিছুর সুবিধা নেই। কিন্তু যদি প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠে, তাহলে শিশুরা নিরাপদে পড়াশুনা করতে পারবে।’
এ সময় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী বলেন, ‘আমাদেরকে সুইপিং মেশিন দুটি দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা সুফল পাচ্ছি। তাই এর সংখ্যা আরও বাড়ানোর অনুরোধ করছি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদেরকে বলা হচ্ছে ইনকাম বাড়ানোর জন্য। কিন্তু আমরা দেখেছি, ইনকামের বড় একটা অংশ চলে যায় রাউজকের কাছে। কারণ, প্ল্যানিং পাস তাদের মাধ্যমে হয়। এর ফলে এ প্ল্যানিং পাসের মাধ্যমে যে আয় হয়, তা করপোরেশন পায় না। তাই যদি প্ল্যানিং পাসটা করপোরেশনকে দেওয়া হয়, তাহলে আমাদের ইনকামের পরিধি বাড়বে।’
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. হেলাল উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় আরও বক্তব্য দেন— ডিউক ইউনিভার্সিটির প্রফেসর রয় ক্যালী, জাইকার বাংলাদেশের প্রধান প্রতিনিধি উহো হায়াকাওয়া ও স্থানীয় সরকার বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা।