সাংবাদিক রোজিনার মুক্তির দাবি বিভিন্ন দল ও সংগঠনের

প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামকে সচিবালয়ে হেনস্তা, আটক, মামলা এবং কারাগারে প্রেরণের ঘটনায় আজও উদ্বেগ এবং প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন দল ও সংগঠন। বৃহস্পতিবার (২০ মে) প্রতিবাদ জানানো বিভিন্ন দল ও সংগঠনের মধ্যে আছে জাতীয় পার্টি, বাম গণতান্ত্রিক জোট, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে), বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে), নাট্যকর্মীদের সংগঠন প্রাচ্যনাট ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। এছাড়া রোজিনা ইসলামের মুক্তির দাবিতে ৩৪ আলোকচিত্রী দিয়েছেন বিবৃতি।

জাতীয় পার্টির প্রতিবাদ

সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে হেনস্তার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি করেছে জাতীয় পার্টি। দলটির চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেন, ‘তদন্ত রিপোর্ট দাখিল না হওয়া পর্যন্ত আমরা রোজিনা ইসলামের জামিন দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। যারা সাংবাদিক রোজিনাকে হেনেস্তা করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।’ বৃহস্পতিবার (২০ মে) দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জাতীয় পার্টি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আয়োজিত ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলের পৈশাচিক হামলা বন্ধ এবং রোজিনা ইসলামের মুক্তির দাবিতে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে জিএম কাদের এসব কথা বলেন।

তিনি  বলেন, ‘গণমাধ্যমকর্মীদের চাকরির সুরক্ষা এবং কাজের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করতে গণমাধ্যম কর্মীদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।’

জিএম কাদের বলেন, ‘দৈনিক প্রথম আলোর অনুসন্ধানী প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামের সঙ্গে যে বর্বরতা হয়েছে, তা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। একজন অনুসন্ধানী প্রতিবেদক তথ্য সংগ্রহ করবেন এতে অপরাধের কিছু নেই। অনুসন্ধানী প্রতিবেদকদের জন্যই আমরা জানতে পারি বিভিন্ন দফতরের লুটপাটের খবর।’ তিনি বলেন বলেন, ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ কালো আইন। ১৯২৩ সালে ব্রিটিশ সরকার তাদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে নিবর্তনমূলক এই আইনটি পাস করে। স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমন কালো আইন জনস্বার্থবিরোধী।’

রোজিনার মুক্তি চায় বাম গণতান্ত্রিক জোট

রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে তাকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। বৃহস্পতিবার (২০ মে) জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জোটটি আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে এ দাবি জানানো হয়।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, রোজিনা ইসলামকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার প্রমাণ করেছে, বর্তমান সরকার দুর্নীতিবাজদের রক্ষাকর্তা। রোজিনার গ্রেফতারের ঘটনা স্বাধীন সাংবাদিকতা, মানবাধিকার ও নাগরিক মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে এবং নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করেছে। এই ঘটনা আরও প্রমাণ করেছে সরকার সত্য গোপন করতে চায়। শুধু তাই নয়, সরকার জনগণের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের চাইতে দুর্নীতি লুকাতে তৎপর বেশি।

তারা আরও বলেন, তথ্য অধিকার আইনে তথ্য জানার অধিকার জনগণের আছে। জনগণকে তথ্য না জানানো চুরি, দুর্নীতি, জবাবদিহিহীনতাকে উৎসাহিত করে। দেশ ও জনগণের স্বার্থে দুর্নীতি, অনিয়মের তথ্য বের করে আনা কোনও মতেই চুরি না। আর এটা সাংবাদিকতার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। রোজিনা ইসলাম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের বেশ কয়েকটি দুর্নীতি ও অনিয়মের অনুসন্ধানী রিপোর্ট পত্রিকায় প্রকাশ করে। এ জন্যই তাকে সচিবালয়ে সাড়ে ৫ ঘণ্টা আটকে রেখে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে, যা সভ্য দেশে অকল্পনীয়।

বক্তারা দাবি জানিয়ে বলেন, ১৯২৩ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশিক আমলের আইন ‘অফিসিয়াল সিক্রেট্স অ্যাক্ট’, যা স্বাধীন দেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারায় যুক্ত করা হয়েছে। সেই কুখ্যাত আইনে রোজিনাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। অবিলম্বে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের নিঃশর্ত মুক্তি, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, রোজিনাকে হেনস্তাকারী আমলা ও পুলিশের শাস্তি; ব্যর্থ ও দুর্নীতিবাজ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য সচিবকে অপসারণ, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল এবং সংবাদপত্র-সাংবাদিকতার ওপর হস্তক্ষেপ বন্ধ করার জোর দাবি জানাচ্ছি।

রোজিনার মুক্তিসহ সাংবাদিকদের ৪ দাবি

প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামের নিঃশর্ত মুক্তিসহ সাংবাদিকরা চার দফা দাবি জানিয়েছে। তাদের অন্যান্য দাবিগুলো হচ্ছে—রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার; হেনস্তাকারী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অসাধু কর্মকর্তাদের শাস্তি প্রদান এবং সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা। বৃহস্পতিবার (২০ মে) জাতীয় প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) আয়োজিত ‘অবিলম্বে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের মুক্তি চাই ও স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের শাস্তি চাই’ শীর্ষক এক মানববন্ধন থেকে এসব দাবি জানানো হয়।

মানববন্ধনে ডেইলি অবজারভারের সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, ‘রোজিনা ইসলাম অপরাধ করেননি। তার বিরুদ্ধে আজকে যারা বেআইনিভাবে মামলা দিয়েছেন এবং গ্রেফতার করেছেন তাদের বিরুদ্ধে নিন্দা জানানো এবং তাদের বিচারের দাবিতে আমরা আজকে সমবেত হয়েছি। যে অভিযোগ রোজিনার বিরুদ্ধে করা হচ্ছে, তা হলো তিনি তথ্য/গোপন নথি চুরি করেছিলেন। কোন তথ্যের কথা বলা হচ্ছে? তিনি তো সেখানে কোনও টাকা-পয়সা চুরি করতে যাননি, সেখানে কম্পিউটার চুরি করতে যাননি। তাদের কথা যদি আমি মেনে নিই, তাহলে তিনি তথ্য চুরি করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ওই তথ্য তো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নয়, সে তথ্য জনগণের। কর্মকর্তারা জনগণের যে তথ্য গোপন করে রেখেছিলেন সেটি নিয়ে জনগণকে উপহার দেওয়ার জন্য রোজিনা গিয়েছিলেন।’

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সভাপতি মোল্লা জালাল বলেন, ‘আমরা বেশি কিছু চাই না। আমরা রোজিনার নিঃশর্ত মুক্তি চাই, মামলা প্রত্যাহার চাই, হেনস্তাকারীদের শাস্তি এবং এই ঘটনা অনুসন্ধানের জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি চাই। যাতে সাংবাদিকদের অংশগ্রহণ থাকবে।’ মানববন্ধনে সাংবাদিক নেতা মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ আলম খান তপুসহ অন্য সাংবাদিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রাচ্যনাটের নাট্য পদযাত্রা

সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের মুক্তি দাবিতে নাট্য পদযাত্রা করেছে নাট্যকর্মীদের সংগঠন প্রাচ্যনাট। বৃহস্পতিবার (২০ মে) বিকাল ৪টায় নাট্য পদযাত্রাটি বাংলাদেশ সচিবালয় থেকে শুরু হয়ে শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়।

সমাবেশে প্রাচ্যনাটের মুখ্য সম্পাদক তৌফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সমাজের অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরার অধিকার অন্য সবার মতো প্রাচ্যনাটেরও আছে। যেহেতু আমরা নাটকের দল তাই সমাজের অসঙ্গতিগুলো আমাদের মতো করে তুলে ধরতে চাই। আমরা মনে করি, তার জামিন না হওয়াটা একটা বিস্ময় এবং একজন সাংবাদিককে আপনি কখনোই গলা টিপে ধরতে পারেন না। প্রাচ্যনাট মনে করে, যেকোনও প্রতিবাদ ফেসবুকে না করে রাস্তায় নামার একটা সময় এসেছে আমাদের। না হলে কোনও কিছুই আমরা যেভাবে চাচ্ছি, সেভাবে চলবে না। আমলাতন্ত্রের বেড়াজাল আমাদের একেবারে আবদ্ধ করে ফেলবে। যেকোনও অসঙ্গতি এলে আমরা সবাইকে রাস্তায় নামার আহ্বান করছি।’

৩৪ বিশিষ্ট আলোকচিত্রীর বিবৃতি

রোজিনা ইসলামকে সচিবালয়ের মতো জায়গায় আটকে রেখে নির্যাতন এবং পরবর্তীতে গ্রেফতারের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন দেশের ৩৪ জন বিশিষ্ট আলোকচিত্রী। বৃহস্পতিবার (২০ মে) এক যৌথ বিবৃতিতে এ নিন্দা জানান তারা।

আলোকচিত্রীরা বলেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি কক্ষে প্রায় ছয় ঘণ্টা যে হেনস্তার ঘটনা ঘটে তা নজিরবিহীন। এ ধরনের ঘটনাকে আলোকচিত্রীরা স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা চর্চার পথে বাধা ও হুমকিস্বরূপ বলে মনে করেন।

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন, স্বপন সাহা, শহিদুল আলম, আবদুল মালেক বাবুল, ফরিদ আক্তার পরাগ, মো. মইন উদ্দীন, সফিকুল আলম, সফিকুল আলম কিরণ, মুনিরা মোরশেদ মুন্নী, ইমতিয়াজ আলম বেগ, আবীর আবদুল্লাহ, পল ডেভিড বারিকদার, জিএমবি আকাশ, মনিরুল আলম, মীর শামছুল আলম বাবু, সৈয়দ লতিফ হোসেন, সাহাদাত পারভেজ, দীন মোহাম্মদ শিবলী, তাসলিমা আখতার, বশীর আহমেদ সুজন, স্নিগ্ধা জামান, কাকলী প্রধান, সাইফুল হক অমি, জান্নাতুল মাওয়া, আল ইমরান গর্জন, তানভীর মুরাদ তপু, আমীরুল রাজীব, তানজিম ওয়াহাব, মুনিরুজ্জামান, কে এম আসাদ, এ কে এমদাদুল ইসলাম বিটু, রাসেল চৌধুরী, সালমা আবেদীন পৃথি ও আহমেদ শফিউদ্দীন।

মহিলা পরিষদের উদ্বেগ

রোজিনা ইসলামকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সংগঠনটি জানায়, মানবিক কারণ থাকার পরও এখনও তার জামিন না হওয়ায় তিনি কাশিমপুর কারাগারে অসুস্থ অবস্থায় রয়েছেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ অসুস্থ অবস্থায় একজন সিনিয়র নারী সাংবাদিক জেলহাজতে থাকার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম এবং সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু।