বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন বন্ধে পদক্ষেপ চান মানবাধিকার কর্মীরা

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন আলোচকরা। তারা বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন বন্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সংবিধান, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার জন্য সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশ দিতে হবে।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র আয়োজিত ‘বাংলাদেশে নির্যাতনের পরিস্থিতি: নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে প্রতিবন্ধকতাসমূহ’ শীর্ষক অনলাইন আলোচনা সভায় শনিবার (২৬ জুন) আলোচকরা এসব কথা বলেন।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগীদের সমর্থনে আন্তর্জাতিক দিবসের প্রাক্কালে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যুর শিকার ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা ও তাদের পরিবারের সঙ্গে সমর্থন জানিয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ‘বাংলাদেশে নির্যাতনের পরিস্থিতি: নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে প্রতিবন্ধকতাসমূহ’ শীর্ষক একটি অনলাইন আলোচনা সভার আয়োজন করে।

বিদ্যমান নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যুর পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোকপাতসহ বিভিন্ন বিষয়ে তারা এ আলোচনা সভার আয়োজন করে।

অন্য বিষয়গুলো হচ্ছে, নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের বিচারে পাওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান নানা প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করা ও তার সমাধান বের করা। সভায় অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে নীতিনির্ধারকদের জন্য নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু বন্ধে নির্দিষ্ট সুপারিশ তৈরী করা। নির্যাতন বন্ধে সরকার ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে অ্যাডভোকেসি প্রক্রিয়া আরও সক্রিয় ও জোরালো করা।

আলোচনার শুরুতেই আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক গোলাম মনোয়ার কামাল বলেন- জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী সনদ স্বাক্ষরিত হওয়ার বহু আগে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর প্রণীত বাংলাদেশের সংবিধানে নির্যাতনকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশ সংবিধানে বলা আছে- কোনও ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাবে না। নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাবে না। তার সঙ্গে অনুরূপ ব্যবহার করা যাবে না। অথচ আটক বা গ্রেফতারের পর রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুলিশ, পুলিশের গোয়েন্দা শাখা, র‌্যাব, বা অন্যান্য রাষ্ট্রীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যগন দ্বারা শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করার অভিযোগ রয়েছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিচালক (কর্মসূচি) নীনা গোস্বামী হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর বর্তমান পরিস্থিতি এবং আসক-এর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন আলোচনায়। তিনি বলেন, অধিকাংশ সময় ভুক্তভুগী বা তার পরিবার নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে আইনের আশ্রয় নেওয়া তথা মামলা করার সাহস পান না। যারা সাহস করে মামলা করেছেন তারা নানা পর্যায়ে হয়রানি ও হুমকির শিকার হচ্ছেন। ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা প্রতিকূলতার শিকার হচ্ছেন।

আসকের নির্বাহী কমিটির মহাসচিব মানবাধিকার কর্মী মো. নূর খান বলেন, বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড, গুম এবং হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু একটি নিত্যনৈমিত্ত্যিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহ এ বিষয়ে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে এমন সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়, যারা এসব বিষয়ে খুব বেশি প্রশ্ন তুলবে না। সরকারকে বিব্রত করবে না। এ কঠিন পরিস্থিতিতে নির্যাতিত ও তাদের পরিবারের অধিকার রক্ষায় বিচ্ছিন্নভাবে নয়, একযোগে সামগ্রিক লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, গণমাধ্যম নানামুখী সমস্যায় রয়েছে। একদিকে কর্পোরেট হাউজগুলোর দৌড়াত্ম্য যেখানে ব্যবসায়িক স্বার্থ প্রাধান্য পায়, অন্যদিকে অসংখ্য অনলাইন গণমাধ্যম তৈরি হয়েছে। যাদের নীতি-নৈতিকতার বালাই নেই। আবার যারা সত্যিকার সাংবাদিক তারা কাজ করতে পারছে না নানামুখী চাপের কারণে। তারা আত্ম-নিয়ন্ত্রণ করতে বাধ্য হচ্ছে। তিনি প্রচলিত গণমাধ্যম নয়, বিকল্প গণমাধ্যমের (যেমন- কম্যুনিটি মিডিয়া) মাধ্যমে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দেন।

অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান বলেন, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, উন্নয়ন এবং মানবাধিকার একই সূত্রে গাঁথা। একটি ছাড়া অন্যটি পরিপূর্ণভাবে অর্জন সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা বর্তমানে উন্নয়নকে প্রাধান্য দিচ্ছি অন্য সব কিছুতে দমিয়ে, পাশ কাটিয়ে।

 সভাশেষে সবাই একসাথে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি ও পরিবারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে যে যার অবস্থান থেকে তাদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হওয়ার এবং তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করার অঙ্গীকার করেন।