দেশে দুর্ঘটনাজনিত কারণে পঙ্গু হয়ে যারা ভিক্ষাবৃত্তি করছেন, তাদের মধ্যে ৮২ দশমিক ৫৩ শতাংশ ভিক্ষুক সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়েছেন। এছড়া ১৭ শতাংশ ৪৬ শতাংশ পঙ্গু হয়েছেন গাছ থেকে পড়াসহ অন্যান্য কারণে।
বুধবার (১৪ জুলাই) গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন এ তথ্য জানিয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পঙ্গু ভিক্ষুকদের ৩২ দশমিক ৬৯ শতাংশ মোটরযানের (বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, ট্রাক্টর, ট্রলি) শ্রমিক হিসেবে কর্মরত অবস্থায় দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছেন। ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশ স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন (নসিমন, ভটভটি, চান্দের গাড়ি, টমটম, অটোরিকশা, অটোভ্যান, প্যাডেল রিকশা, ঠ্যালাগাড়ি ইত্যাদি) চালানোর সময় দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছেন। ৪২ দশমিক ৩০ শতাংশ মোটরযানের যাত্রী হিসেবে দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছেন এবং ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ পথচারী হিসেবে রাস্তায় চলাচলের সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।
দুর্ঘটনার পর মোটরযান মালিকদের কাছ থেকে চিকিৎসার জন্য সামান্য সহযোগিতা পেয়েছেন ১১ দশমিক ৫৩ শতাংশ ভুক্তভোগী। তবে কেউই মোটরযানের তৃতীয়পক্ষীয় ঝুঁকি বিমার মাধ্যমে কোনও আর্থিক সুবিধা পাননি। দুর্ঘটনার পর চিকিৎসার জন্য আত্মীয়-স্বজন ও সাধারণ মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা পেয়েছেন সকলেই।
দুর্ঘটনায় সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা সেবায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ২৫ শতাংশ ভুক্তভোগী, অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ৫৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ। মন্তব্য করেননি ১৯ দশমিক ২৩ শতাংশ ভুক্তভোগী। শুধু সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করেছেন ৮৪ দশমিক ৬১ শতাংশ। চিকিৎসার কোনও এক পর্যায়ে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
দুর্ঘটনার সময় ৫১ দশমিক ৯২ শতাংশ ভুক্তভোগীর বয়স ছিল ১৩ থেকে ২৫ বছর। ৩০ দশমিক ৭৬ শতাংশের বয়স ছিল ২৬ থেকে ৪০ বছর এবং ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশের বয়স ছিল ৪১ থেকে ৬০ বছর।
দুর্ঘটনার পূর্বে ৩২ দশমিক ৬৯ শতাংশের পেশা ছিল মোটরযানের চালক-শ্রমিক। ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশের পেশা ছিল স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের চালক-শ্রমিক। মুদি দোকানি ছিল ১৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ, চা দোকানি ও হকার ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ, সবজি বিক্রেতা ১১ দশমিক ৫৩ শতাংশ, কৃষি ও নির্মাণ শ্রমিক ১৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ, ঘাটের মাঝি ও মৎস্যজীবী ছিল ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসার জন্য পারিবারিক সম্পত্তি (জমি ও গৃহপালিত পশু) বিক্রি করেছেন ৬৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ ভুক্তভোগীর পরিবার। বিক্রি করার মতো তেমন সম্পত্তি ছিল না ৩৪ দশমিক ৬১ শতাংশ পরিবারের।
দুর্ঘটনার পূর্বে আর্থিক অবস্থা কেমন ছিল এমন প্রশ্নের উত্তরে ৪০ দশমিক ৩৭ শতাংশ বলেছেন, মোটামুটি চলছিল। ৫৯ দশমিক ৪২ শতাংশ বলেছেন কষ্ট করে দিনাতিপাত করতাম।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ৬৩ জন পঙ্গু ভিক্ষুকের ওপর সাক্ষাৎকারভিত্তিক জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত রাজধানী ঢাকার ১৯টি স্থানসহ ধামরাই, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ (আরিচা ও পাটুরিয়া ফেরিঘাট) রাজবাড়ি (গোয়ালন্দ ফেরিঘাট) যশোর, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া অঞ্চলে এই জরিপ কাজ করা হয়।
জরিপ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য মোটরযানে তৃতীয়পক্ষীয় ঝুঁকি বিমা বাধ্যতামূলক আছে এবং এই বিমার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়। বাংলাদেশে ‘মোটর ভেহিক্যাল অর্ডিন্যান্স এ্যাক্ট-১৯৮৩’ -এ মোটরযানে তৃতীয়পক্ষীয় ঝুঁকি বিমা বাধ্যতামূলক ছিল এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য জেলা ও দায়রা জজ আদালত ছিল ক্লেইম ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু দুঃখজনক যে, এই আইনের মাধ্যমে কেউ ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন এমন নজির দেখা যায়নি। বিমা কোম্পানিগুলো নিয়মিত প্রিমিয়াম নিলেও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী ছিল না। তাদের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরকারও কোনও ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। ফলে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত গরিব মানুষেরা চিকিৎসার জন্য সহায়-সম্বল বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে পথের ভিখারীতে পরিণত হয়েছেন।
আবার আগের আইনে কেউ ক্ষতিপূরণ পায়নি এই অজুহাতে সরকার ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-তে মোটরযানের তৃতীয়পক্ষীয় ঝুঁকিবিমা বিলোপ করে একটি ‘ট্রাস্ট ফান্ড’ এর বিধান রেখেছে, যার সাংগঠনিক কাঠামো এবং তহবিল সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। এই তহবিল থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ পাওয়া খুবই দুরূহ হবে বলে আশঙ্কা করে জরিপ পরিচালনাকারী সংগঠন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ প্রণয়নের এতদিন অতিবাহিত হলেও এখনও ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করা হয়নি। অথচ প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় বহু মানুষ আহত-নিহত হচ্ছে। পঙ্গু ভিক্ষুকদের তালিকাও দীর্ঘ হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ভাবার এবং দেখার কেউ নেই।