সুষ্ঠু বিচারের লক্ষ্যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য স্বতন্ত্র মানবাধিকার কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. খায়রুল ইসলাম চৌধুরী। মঙ্গলবার (১৭ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে শেরপুরের শ্রীবরদীতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কৃষকদের জুম ফসল কেটে ফেলার প্রতিবাদ এবং সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে হাজং নারীর ওপর যৌন নিপীড়নের বিচার দাবিতে ‘বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি এ দাবি জানান।
সমাবেশে খায়রুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের নিপীড়ন, ধর্ষণ ও জমি থেকে উচ্ছেদের শিকার হচ্ছে, কিন্তু এর কোনও বিচার হচ্ছে না। আমি মনে করি, তাদের যথাযথ অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে স্বতন্ত্র মানবাধিকার কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অংশীদার জাতীয় জাদুঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আজকে আমরা ধর্ষক, নিপীড়ক ও উচ্ছেদকারীর বিরুদ্ধে কথা বলছি। কিন্তু কথা ও প্রতিবাদ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর একটি স্থায়ী সমাধান জরুরি। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন এবং বহু জাতির আশা ভরসার দেশ। দেশের টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ অঞ্চলে কোনও সরকারি গণভূমি ছিল না। এগুলো সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শ্রমে গড়ে উঠা ভূমি।’
তিনি আর বলেন, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ৭০ বছরের বেশি সময় ধরে সেখানে বসবাস করে আসছে। সেখান থেকে তাদের উচ্ছেদ করার যে ষড়যন্ত্র চলছে, তা রুখে দিতে হবে। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের উচ্ছেদ করার কোনও নিয়ম নেই।’
সমাবেশে ঢাবির নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীন বলেন, ‘দেশে চলমান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন ও ধর্ষণের বিষয়কে শুধু পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের দৃষ্টিকোণ দিয়ে বিচার করলে হবে না। এগুলোর জন্য দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নারীদের প্রতি প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতি সমানভাবে দায়ী।’
তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন, ধর্ষণের কোনও বিচার হয় না। ধর্ষককে গ্রেফতার করা হলেও দুদিন পর ছাড়া পেয়ে যায়। এই যে দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি, খামখেয়ালি আচরণ এবং এক ধরনের এড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতার কারণে আজ তাদের প্রতি নিপীড়ন, অত্যাচার, ধর্ষণ ও উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র চলছে।’
সমাবেশ সংগঠনের নেতৃত্ববৃন্দ পাঁচ দফা দাবি পেশ করেন। সেগুলো হলো—শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচটি গারো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়া। সংশ্লিষ্ঠ কাজে জড়িত রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বিট অফিসারকে অপসারণ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রথাগত ভূমির অধিকার দেওয়া, হাজং নারীর ওপর যৌন নিপীড়নকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা, মৌলভীবাজারের ডলুছড়া এবং সাহেবটিলার গারো ও খাসিয়াদের উচ্ছেদ করার ষড়যন্ত্র বন্ধ করা এবং সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা।
সভাপতির বক্তব্যে অলিক মৃ বলেন, ‘সারাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নারীর ধর্ষণ করার মহোৎসব চলছে। দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করা জনগোষ্ঠীকে কীভাবে ক্ষতি করা হচ্ছে তা আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাদের উচ্ছেদ করার ষড়যন্ত্র চলছে। অবিলম্বে দোষীদের চিহ্নিত করে দৃষ্ঠান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় “আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ” দেশের সব ছাত্র সংগঠনকে নিয়ে প্রতিটি জেলায় দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলবে।’
সংগঠনটির সাংগাঠনিক সম্পাদক বাদল হাজংয়ের সঞ্চালনায় ও সাধারণ সম্পাদক অলিক মৃ’র সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠন (বাগাছাস), হাজং ছাত্র সংগঠন, হাজং স্টুডেন্টস কাউন্সিল, খাসিয়া স্টুডেন্টস ইউনিয়ন, বাংলাদেশ ত্রিপুরা স্টুডেন্টস ফোরামের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা।