ভুক্তভোগীদের মামলাকে কেন্দ্র করে রাজারবাগ দরবার শরীফের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে বাংলাদেশ পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ-সিআইডি। তদন্তে নেমে বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ভয়ংকর সব তথ্য তুলে এনেছে এই গোয়েন্দা সংস্থা। নির্দেশনা অনুসারে ইতোমধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেশের উচ্চ আদালতেও দাখিল করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনে ড. মুহাম্মদ শহিদুল্লাহর নাতিসহ নিজ ভাইয়ের বিরুদ্ধেও হয়রানিমূলক মামলার তথ্য রয়েছে পীর দিল্লুর ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে।
পীর দিল্লুর রহমান ও তার অনুসারীদের সম্পদের তথ্যবিবরণী দাখিলের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন ৮ ভুক্তভোগী। রিটকারীদের মধ্যে শিশু, নারী, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, মাদ্রাসার শিক্ষক ও ব্যবসায়ী রয়েছেন। তাদের প্রত্যেকে রাজারবাগ দরবার শরিফের পীর ও তাদের মুরিদদের হয়রানিমূলক মামলার শিকার।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর দায়ের করা ওই রিটের ওপর আদেশ দেন বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। ওই রিটের আদেশে সিআইডিকে রাজারবাগ দরবার শরিফের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে সিআইডিকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এরপর তদন্তের নামে সিআইডি। তদন্ত শেষে তারা হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করে।
পীরের অনুসারীদের করা মামলা ‘সাজানো’
রিট আবেদনকারীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাগুলো পর্যালোচনা করে সিআইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজারবাগ সাইয়্যিদুল আইয়াদ শরিফের পীর মো. দিল্লুর রহমান ও তার অনুসারীদের দায়ের করা মামলার বেশিরভাগই মানবপাচার, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের বিভিন্ন ধারার এবং মামলাগুলো একই প্রকৃতির, যা সাজানো মনে হয়।
মামলার হয়রানি থেকে বাদ যাননি ড. মুহাম্মদ শহিদুল্লাহর নাতি
অনুসন্ধানকালে আরও প্রকাশিত হয়, জনৈক লাকী রাজারবাগ পীরের মুরিদ থাকাকালে কয়েকজন মুরিদের প্ররোচনায় ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ২-এ এম.এম সাইফুল্লাহর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। উল্লিখিত মামলার বিবাদী এম.এম সাইফুল্লাহ ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহিদুল্লাহর নাতি বলে তদন্তে জানতে পারে সিআইডি।
ছোট ভাইয়ের বিরুদ্ধে হয়রানির মামলা
তদন্তকালে পীর দিল্লুরের ছোট ভাই জিল্লুর রহমান (৬৩) সিআইডিকে জানান, দরবারের সম্পত্তি নিয়ে তার বড় ভাই দিল্লুর রহমানের সঙ্গে তাদের অপর দুই ভাই আনিসুর রহমান ও হাফিজুর রহমানের মতবিরোধ হয়। এরপর দিল্লুর রহমানের পরিকল্পনায় দেশের বিভিন্ন জেলায় তাদের তিন ভাইয়ের নামে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। পরে আনিসুর রহমান ও হাফিজুর রহমান বড় ভাই দিল্লুর রহমানের সঙ্গে সমঝোতা করায় তাদের বেশিরভাগ মামলা খারিজ হয়ে যায়। তবে বর্তমানে তার (জিল্লুর) বিরুদ্ধে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে ৭টি মামলা চলমান রয়েছে।
মামলাগুলো হয়রানিমূলক
তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে সিআইডি জানায়, রিট আবেদনকারী ৮ জনসহ অন্যদের বিরুদ্ধে রাজারবাগ সাইয়্যিদুল আইয়াদ শরিফের পীর দিল্লুর রহমান তার মুরিদদের সঙ্গে যোগসাজশে ঢাকা এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় মানবপাচার মামলাসহ বিভিন্ন হয়রানিমূলক ও মিথ্যা মামলা দায়ের করেন।
হয়রানিমূলক মামলার বাদীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করে সিআইডি।
তদন্ত প্রতিবেদনে সিআইডির মতামত
হাইকোর্টে দাখিল করা প্রতিবেদনে মতামত দিয়েছে সিআইডি। এতে বলা হয়, রাজারবাগ দরবারের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘দৈনিক আল ইহসান’ ও ‘মাসিক আল বাইয়্যিনাত' পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যা, তাদের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত বিভিন্ন বই, ইতোপূর্বে তাদের কার্যক্রম এবং বিভিন্ন জেলায় তাদের অনুসারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা তদন্তের ফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তারা ইসলাম ধর্মের নামে এবং অনেক ক্ষেত্রে পবিত্র কোরআন ও হাদিসের খণ্ডিত ব্যাখ্যার মাধ্যমে দেশের ধর্মভীরু মানুষকে ভুলপথে পরিচালিত করে আসছে। ধর্মের নামে মানুষ হত্যা ও তথাকথিত জিহাদকে উসকে দিচ্ছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলো যে উদ্দেশ্য নিয়ে তাদের মতবাদ প্রচার করছে ও কার্যক্রম চালাচ্ছে, রাজারবাগ দরবার শরিফের পীর, তার সহযোগী ও অনুসারীদের কর্মকাণ্ডও সাদৃশ্যপূর্ণ।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, সারা দেশে অসংখ্য খানকা, মাদ্রাসা, মসজিদসহ নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান খুলে সহজ সরল অমানুষকে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে দরবারের অনুসারী করার চেষ্টা করা হয়। আর এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে তাদের মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করার যে অভিযোগ উঠেছে, তারও প্রাথমিক সত্যতা রয়েছে।
ভিন্ন মতাবলম্বী ও ভিন্ন ধর্মের মানুষকে, তাদের ভাষায় মালাউনদের হত্যা করা ইমানি দায়িত্ব উল্লেখ করে ফতোয়া দেওয়ার প্রমাণও পাওয়া গেছে। যা মূলত নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবি ও আনসার আল ইসলামের ফতোয়ার অনুরূপ। তাদের এ ধরনের ফতোয়া ও বক্তব্য মানুষকে জঙ্গিবাদের দিকে ধাবিত করবে, অসহিষ্ণু করবে, অসাম্প্রদায়িক চেতনা নষ্ট করতে ভূমিকা রাখবে।
আদালতে জমা দেওয়া সিআইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, তাদের প্রচারণা ও অন্যান্য কার্যক্রমের মাধ্যমে মূলত তারা এ দেশের হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং গণতন্ত্রবিরোধী একটি শ্রেণি বা গোষ্ঠী তৈরি করতে চাচ্ছে। এছাড়া, তারা ছোঁয়াচে রোগবিরোধী ও বাল্যবিবাহের পক্ষে বিভিন্ন বক্তব্য ও ফতোয়া দিয়ে ধর্মভীরু ও সহজ সরল সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।
সার্বিক পর্যালোচনায় সিআইডির কাছে প্রতীয়মান হয়, পীর দিল্লুর ও তার অনুসারী এবং তাদের সংগঠন এখনও জঙ্গি সংগঠন হিসেবে কালো তালিকাভুক্ত না হলেও তাদের বিভিন্ন প্রকাশনা, বক্তব্যের কারণে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একইসঙ্গে তাদের এসব বক্তব্য ও প্রচার প্রচারণা জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়া ব্যক্তিদের ‘লোন উলফ’ হামলায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে।
অনুসন্ধানে পাওয়া নতুন তথ্য
সিআইডি জানিয়েছে, বাদীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অভিযোগ, অভিযুক্তদের জবানবন্দি ও সাক্ষীদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ঢাকার বিভিন্ন স্থান, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়িতে সরেজমিন আরও অনুসন্ধান করা হয়। অনুসন্ধানে বেশ কিছু অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। বিশেষ করে বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় উগ্রবাদ, ধর্মীয় কুসংস্কারের প্রচার-প্রচারণার প্রমাণ পাওয়া যায়।
প্রকাশ্য ও গোপনীয় অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, আলোচ্য পীর দিল্লুর রহমান ও তার রাজারবাগ দরবার শরিফ আশির দশক থেকে এখন পর্যন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এই সময়ে তারা পবিত্র ইসলাম ধর্ম ও মানুষের ধর্মানুভূতি সুকৌশলে ব্যবহার করে মানুষকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও প্রচলিত আইনের বিপক্ষে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। তাদের এরূপ কার্যক্রমের কারণে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে মামলা হয়েছে।