ফরিদপুরে ছেলের ‘দায়ে’ বাবার বিরুদ্ধে সালিশ ও জরিমানার আদেশ ‘বেআইনি’

ফরিদপুরের নগরকান্দায় অন্যের স্ত্রীকে ‘ভাগিয়ে নেওয়ার’ অভিযোগ উঠেছে মুন্নু মাতবরের ছেলে আনিস মাতবরের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় উপজেলার কাইচাইল ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে সালিশ বসে। সালিশে ৭২ ঘণ্টার ওই নারীকে উপস্থিত ও ফেরত চাওয়া হয়। অন্যথায় আনিস মাতবরের পিতাকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা দিতে হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সালিশের ওই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি ‘বেআইনী’ বলে মত আইনজীবীদের।

আনিসের বিরুদ্ধে শাহিন ফকিরের স্ত্রীকে ভাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগে গত ৩০ জানুয়ারি বসেছিল সালিশ। ওইদিন সন্ধ্যায় উপজেলার কাইচাইল ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে সালিশে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

‘পালিয়ে যাওয়া’ ওই নারীর স্বামী শাহিন ফকিরের দাবি, আনিস মাতবর তার স্ত্রীকে ভাগিয়ে নিয়ে গেছে। তার স্ত্রী পালিয়ে যাওয়ার সময় তিন ভরি গহনা এবং নগদ ২ লাখ টাকা নিয়ে গেছেন। আনিস এর আগেও ভাঙ্গা থেকে এক নারীকে ভাগিয়ে নিয়ে এসে অর্থ আত্মসাৎ করে তাকে তাড়িয়ে দেয়।’

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. জে আর খান রবিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সমাজে মানুষের বাহ্যিক আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণ, অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণ, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং সামাজিক অগ্রগতি ও কল্যাণ লাভের উদ্দেশ্যে আইনের ভূমিকা অপরিসীম। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইউনিয়ন পর্যায়ে কতিপয় বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ‘গ্রাম আদালত আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৩)’ প্রণয়ন করা হয়।

উক্ত আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী, তফসিলের প্রথমাংশে উল্লেখিত ফৌজদারী অপরাধের (৩২৩, ৪২৬, ৪৪৭, ১৪৩, ১৪৭, ১৪১,১৬০,৩৩৪,৩৪১,৩৪২, ৩৫২, ৩৫৮, ৫০৪, ৫০৬, ৫০৮, ৫০৯, ৫১০, ৩৭৯, ৩৮০, ৩৮১, ৪০৩, ৪০৬, ৪১৭, ৪২০, ৪২৭, ৪২৮, ৪২৯ দণ্ডবিধি) ক্ষেত্রে ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ এবং দ্বিতীয় অংশে উল্লেখিত ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল্যমানের বিরোধীয় স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি (চুক্তি মূলে অর্থ আদায়, স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি পুনরুদ্ধার, গবাদি পশু কর্তৃক ক্ষতি সাধনসহ শ্রমিকের মজুরি বা ক্ষতিপূরণ আদায়ের মামলা) গ্রাম আদালত কর্তৃক বিচার্য। অর্থাৎ গ্রাম আদালতের আর্থিক এখতিয়ার ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। এর ব্যতিক্রম হলে তা হবে গ্রাম আদালতের এখতিয়ার বহির্ভূত ও বেআইনি।

জে আর খান রবিন আরও বলেন, যেহেতু আইনে গ্রাম আদালতের এখতিয়ার নির্ধারিত আছে সেহেতু ফরিদপুরের ঘটনায় অভিযুক্তের পরিবারকে সালিশি বৈঠক থেকে দেওয়া আল্টিমেটাম ও জরিমানার হুমকি সম্পূর্ণরুপে বেআইনি।

মানবাধিকার কর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এ ধরনের সালিশি সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ বেআইনি। তাদের এ ধরনের বিচারের কোনও ভিত্তি নেই। তারা প্রতিকার চেয়ে অপহরণের মামলা করতে পারতেন। কিন্তু ফতোয়া দেওয়ার মত করে এভাবে তারা কোনও বিচার করতে পারেন না। আইন সে সুযোগ তাদের দেয়নি।
 
তবে আইন বহির্ভূতভাবে যদি ওই সালিশি সিদ্ধান্ত কার্যকরের চেষ্টা করা হয় সেক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর (আনিস মাতবরের পিতা মুন্নু মাতবরের) করণীয় সম্পর্কে ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, এক্ষেত্রে ওই ভুক্তভোগী প্রতিকার চাইতে পারবে। এজন্য সালিশের ঘটনা উল্লেখ করে এবং প্রতিকার চেয়ে স্থানীয় প্রশাসন বা জেলা প্রশাসক অফিস বরাবর বা থানায় এ বিষয়ে অভিযোগ জানাতে পারবে।