বিদেশগামী যাত্রীদের করোনা টেস্ট নেগেটিভ ফল প্রাপ্তির আশ্বাস দিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া প্রতারক চক্রের ১৪ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। বুধবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) রাতে কুমিল্লা, বাহ্মণবাড়িয়া ও রাজধানী ঢাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রতাণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করা প্রায় সাত লাখ টাকা ও প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ১২০টি অবৈধ মোবাইল সিম, সিম এক্টিভেট করার ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন ও ৩২টি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলো—মো. জসিম উদ্দিন (২২), মো. সুলতান মিয়া (১৯), মো. বেলাল হোসেন (৩১), মো. আবুল হোসেন (২৪), মো. আবদুল নূর (২১), মো. আলফাজ মিয়া (১৯), মো. শামিম (৩২), মো. আহাম্মদ হোসেন (১৯), মো. ইমরান উদ্দিন মিলন (১৯), মো. সবুজ মিয়া (২৭), মো. আব্দুর রশিদ (২৮), আব্দুল করিম চৌধুরী (৩২), মো. আঙ্গুর মিয়া (২৫) ও মো. আলমগীর হোসেন (২০)।
তিনি বলেন, ‘করোনাকালীন বিভিন্ন প্রতারক চক্র নানা প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। তারা বিভিন্ন সময়ে সাধারণ জনগণকে ঠকিয়েছে এবং ভূক্তভোগীদের করোনার ভুয়া রিপোর্ট ও এসএমএস দিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিদেশগামী ব্যক্তিদের টার্গেট করে করোনা টেস্টের ভুয়া পজিটিভ রিপোর্টে কথা বলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে আসছে কয়েকটি চক্র।’
তিনি বলেন, ‘বেশকিছু ভুক্তভোগী প্রতারক চক্রকে অর্থ প্রদানের পরও তাদের করোনা রিপোর্ট পজিটিভ আসার প্রেক্ষিতে তারা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতারণা সম্পর্কে জানতে পারে। এ রকম অভিযোগের ভিত্তিতে র্যাবের পক্ষ থেকে গোয়েন্দা নজরদারি করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত বুধবার র্যাব-১১ এর একাধিক আভিযানিক দল প্রথমে কুমিল্লা জেলার কোতোয়ালি থানাধীন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে জসিম ও সুলতানকে গ্রেফতার করে। পরে তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর ও রাজধানী ঢাকার সায়েদাবাদ, রমনা ও মতিঝিল এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রতারক চক্রের অপর সদস্যদের গ্রেফতার করা হয়।’
বেলাল জানায়, প্রতারিত হওয়ার পরপরই সে নিজেই প্রতারণা করে বিপুল অর্থ আয় করার একটি পরিকল্পনা করে। তবে তার বিদেশে যাওয়ার নির্ধারিত তারিখ চলে আসায় সে তার এই পরিকল্পনা তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সবুজকে জানায়। সবুজকে প্রতারণার একটি টিম তৈরি করে দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত টাকা সমানভাগে বন্টনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিদেশে চলে যায়। সবুজ প্রতারণার কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে। তবে বেলালকে ভাগের অংশ ঠিকমতো দিতো না। এ কারণে চার মাস বিদেশে থেকে বেলাল আবার দেশে চলে আসে। এরপর সে জসিম নামে আরেক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে করোনা টেস্টের ফল নেগেটিভ করে দেওয়া নিয়ে প্রতারণা শুরু করে।
র্যাবের কর্মকর্তারা জানান, বেলাল দেশে কয়েক মাস প্রতারণার কাজ করে বিদেশে চলে যেত। আবার বিদেশে কয়েক মাস থেকে দেশে চলে আসতো। বেলাল, সবুজ ও জসিম ৪-৫ বছর আগে চট্টগ্রামে একসঙ্গে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসা করতো।
যেভাবে চলতো প্রতারণা
র্যাব কর্মকর্তারা জানান, প্রতারণার চক্রের সদস্যদের একটি গ্রুপ প্রথমে বিদেশগামী ব্যক্তিদের মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করতো। তারপর আরেক গ্রুপ সেসব নাম্বারে ফোন করে করোনা পজিটিভ এসেছে জানিয়ে, নেগেটিভ করে দেওয়ার নামে অর্থ নিত। বিদেশগামী যাত্রীরাও টিকিট ক্যানসেল হওয়ার ভয়ে প্রতারকদের চাহিদা মতো অর্থ দিয়ে দিতো।
র্যাব কর্মকর্তারা জানান, চক্রের সদস্য আলফাজ, জসিম, শামিম ও সুলতান একই সময়ে বেলাল ও সবুজকে বিভিন্ন জায়গার মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নম্বর দিত। যেসব নম্বর থেকে ভুক্তভোগীরা বেলাল ও সবুজের কথা অনুযায়ী টাকা পাঠালে তারা সেই টাকা সংগ্রহ করতো। তারা প্রতারণার জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে ভিন্ন ভিন্ন জেলায় অবস্থান করে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নম্বর দিত, যাতে কেউ সহজেই তাদের ধরতে না পারে। একই সঙ্গে একটি সিম একবার ব্যবহার করে কিছুদিন বন্ধ রেখে আবারও ব্যবহার করতো। আবার কোনও সিম নিয়ে সন্দেহ হলে তা ফেলে দিত। গ্রেফতারকৃত মিলন তাদের ভুয়া রেজিস্ট্রেশন করা সিম দিয়ে প্রতারণা কাজে সহায়াত করতো।
র্যাব কর্মকর্তারা জানান, গ্রেফতার প্রতারক চক্রের সদস্যরা কেউ প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পার হয়নি। তবু অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সুকৌশলে শত শত মোবাইল সিম নামে বেনামে উত্তোলন করে প্রতারণা করে আসছে।
গ্রেফতার সবুজ মিয়া জানিয়েছে, গত ১০ মাসে সে প্রায় হাজারের অধিক বিদেশগামী যাত্রীর কাছ থেকে জনপ্রতি ১০-১৫ হাজার করে প্রায় এক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এই টাকা দিয়ে সে তার গ্রামের বাড়িতে একটি আলিশান বাড়ি বানিয়েছে। অপরদিকে বেলাল প্রায় ৬ শতাধিক বিদেশগামী যাত্রীদের কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা প্রতারণা করে নিয়েছে। চক্রের অপর সদস্যরা প্রতি মাসে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা করে আয় করতো।