বরিশাল-ঢাকা রুটে চলাচলকারী অ্যাডভেঞ্চার-১ লঞ্চ থেকে এক মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের সঙ্গে জড়িত এক নারীকে গ্রেফতার করেছে নৌপুলিশ।
গত ২০ ফেব্রুয়ারি বরিশাল থেকে অ্যাডভেঞ্চার-১ লঞ্চে ঢাকা আসার পথে অপহৃত হয় মাদ্রাসা শিক্ষার্থী আরাফাত হোসেন শাকিব (১৪)। তার গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জ। সে গাজীপুরের আশরাফিয়া জামিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। গত ২১ ফেব্রুয়ারি ভোরে শাকিব সদরঘাট নামলেও সে মাদ্রাসায় যায়নি। পরিবার বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পায়নি। এই ঘটনায় দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় ২৩ ফেব্রুয়ারি শাকিবের মামা সাইফুল ইসলাম একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। ওই দিন জিডি করে তারা সদরঘাট নৌপুলিশের থানায় আসেন।
মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমরা নৌপুলিশের কাছে আসার পথে আমার বড়ভাগ্নে বাহাদুর খানের মোবাইলে একটি গ্রামীণ ও একটি বাংলালিংক নম্বর থেকে ফোন আসে। এক নারী ফোন দিয়ে জানান, তার নাম আয়েশা। বাহাদুরের কাছে তিনি জানতে চান, ‘শাকিব তার ভাই কিনা?’ বাহাদুর ওই নারীকে বলেন, ‘হ্যাঁ, শাকিব আমার ভাই।’ এই কথা শুনে ওই নারী বলেন, ‘শাকিবকে জীবিত পেতে হলে পাঁচ লাখ টাকা দিতে হবে। তারপর ওই নারীর সঙ্গে আমার ভাগ্নে আসাদ এবং কাতার প্রবাসী ভাগ্নে জাহিদ মুক্তিপণের টাকা লেনদেন ও শাকিবকে পাওয়ার বিষয়ে কথাবার্তা চলতে থাকে।”
ওই নারী শাকিবের পরিবারকে বারবার মুক্তিপণ দেওয়ার চাপ দিতে থাকেন। এসময় তারা শাকিবকে দেখতে চায়। তখন মুক্তিপণ চাওয়া ওই নারী বলেন, ‘ছেলেটি (শাকিব) তার চাচাতো বোন খাদিজার কাছে আছে, টাকা না দিলে ছেলেটিকে মেরে ফেলা হবে।’
শাকিবের পরিবার ওই নারীকে বলেন, ‘পাঁচ লাখ টাকা জোগার করতে তো সময়ের প্রয়োজন হয়, আপাতত কিছু টাকা পাঠিয়ে দেই ছেলেটিকে দেখান। তখন বলে, ঠিক আছে আপাতত দশ হাজার টাকা পাঠান, তাকে দেখানোর ব্যবস্থা করি। তখন ওই নারী একটি রকেট নাম্বার দেয় এবং সেই নাম্বারে তাড়াতাড়ি টাকা পাঠাতে বলে।’
মুক্তিপণ চাওয়ার বিষয়টি নৌপুলিশকে জানায় শাকিবের মামা সাইফুল ও ভাইয়েরা। নৌপুলিশ তখন অপহরণকারীদের মোবাইল নম্বর থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবাসহ দুটি লোকেশন বের করেন। শাকিবকে উদ্ধার ও অপহরণকারীদের গ্রেফতার করার জন্য নৌপুলিশ কসবা থানার সহযোগিতা নেয়। শাকিবের মামা সাইফুলসহ কয়েকজন কসবা চলে যান। নৌপুলিশের পরামর্শে অপহরণকারীদের কাছ থেকে আরও একটি বিকাশ নম্বর নেওয়ার চেষ্টা করেন তারা। এক পর্যায়ে ওই নারী আরও একটি বিকাশ নম্বর দেয়। সেই নম্বরটিও নৌপুলিশকে দেয় সাইফুল। এই নম্বরের ঠিকানা বের করে নৌপুলিশ।
ঠিকানা অনুযায়ী ২৪ ফেব্রুয়ারি দুপুরে কসবা থানার খাবারা বাজারে তৌফিক স্টোরের চারপাশে অবস্থান নেয় শাকিবের স্বজন ও থানা পুলিশ। ওই নারীকে বিকাশে দশ হাজার টাকা পাঠানো হয়। বেলা সোয়া ২টার দিকে ওই নারী দোকানে এসে টাকা তোলার সময় এসআই আমান টাকাসহ তাকে আটক করে টাকা জব্দ করেন।
জিজ্ঞাসাবাদে ওই নারী জানান, তার নাম মনিরা আক্তার সানিয়া (২২)। তার বাবার নাম নজরুল ইসলাম। কসবার খাবারা বাজার এলাকার দেলি নামক গ্রামে তার বাড়ি। তার স্বামীর নাম মহব্বত আলী (২৫)। তার স্বামীর বাড়ি হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার একতিয়ারপুর।
নৌপুলিশকে ওই নারী জানান, গত ২১ ফেব্রুয়ারি তার স্বামী শাকিবকে সদরঘাট টার্মিনাল এলাকা থেকে অপহরণ করে। সে মুক্তিপণের টাকা সংগ্রহ করতে স্ত্রী সানিয়াকে বলে। তবে তার স্বামী শাকিবকে নিয়ে কোথায় আছে তা সে জানাতে পারেননি।
ওই নারীকে গ্রেফতারের পরও শাকিবকে উদ্ধার করতে পারছিল না পুলিশ। অপহরণকারী মহব্বত আলী ঘনঘন তার স্থান পরিবর্তন করছিল। মোবাইল সিমও পরিবর্তন করেছিল। এতে শাকিবকে উদ্ধারে বেগ পেতে হয়।
কসবা, আখাউড়া, সরাইল, গাজীপুর, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ অভিযান অব্যাহত রাখে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার দিকে গাজীপুরের গাজীপুরা মহাসড়কের ওপর অপ্রকৃতস্থ অবস্থায় শাকিবকে পাওয়া যায়।
নৌপুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সোলায়মান মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা শিশুটিকে উদ্ধারে শুরু থেকেই কাজ করি। এজন্য কসবা ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশও সহযোগিতা করেছে। দুই দিন-দুই রাতের টানা অভিযানের পর শাকিবকে উদ্ধার করা হয়।’
এই ঘটনায় দক্ষিণখান থানায় একটি অপহরণ মামলা হয়েছে। এই মামলায় সানিয়ার স্বামী ও অপহরণের মূল হোতা মহব্বতকে আসামি করা হয়েছে। তাকে গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।