একদিন-দু'দিন নয়; দীর্ঘ ২১ বছর ধরে পালিয়ে ছিলেন তিনি। এর মধ্যে একদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলায় বিচার শেষে মৃত্যুদণ্ডও হয়েছে তার, আরেকদিকে পলাতক অবস্থাতেই দিব্যি বিয়ে-শাদি করে তিনি ঘরসংসার করছেন। নানান ছদ্মবেশে থাকার পরও শেষ রক্ষা হয়নি তার। কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) হাতে গ্রেফতার হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখে দুর্ধর্ষ এই জঙ্গির নাম আজিজুল হক ওরফে আজিজ (৪৪)। নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী- বাংলাদেশ হুজিবি’র এই সদস্যকে গ্রেফতারের পর রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে সিটিটিসি।
সিটিটিসির প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. আসাদুজ্জামন বলেন, ‘নিজেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর আড়ালে রাখতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতেন আজিজুল হক। এই দীর্ঘ সময়ে কখনও তিনি দর্জি, কখনও মুদি দোকানদার কখনোবা বই বিক্রেতা বা আবার কখনও গাড়িচালক হিসেবে কাজ করেছেন। এর মধ্যে নিজের অতীত গোপন করে বিয়েও করেছিলেন।
সিটিটিসি সূত্র জানায়, ২০০০ সালের ২০ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার ঘটনার পর থেকেই পলাতক ছিলেন জঙ্গি সদস্য আজিজুল। ঘটনার পরপরই তিনি গোপালগঞ্জ থেকে সরাসরি ঢাকায় চলে আসেন। গাজীপুরের শ্রীপুরের টানভিটার গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করেন। যখন তার সঙ্গী-সাথীরা গ্রেফতার হতে শুরু করে তখনই বাড়ি ছাড়েন তিনি। এরপর থেকেই শুরু হয় তার পলাতক জীবন।
সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘ এই পলাতক সময়ের বেশিরভাগ সময়ই তিনি ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকায় অবস্থান করেছেন। প্রথম দিকে চার মাস ছিলেন নেত্রকোণায়। তারপর পুরান ঢাকা, কেরাণীগঞ্জ, টঙ্গী, খিলক্ষেত থাকার পর রূপগঞ্জের ইছাপুরায় শশুরবাড়ি এলাকায় থাকা শুরু করেন। সর্বশেষ খিলক্ষেত এলাকায় একটি ব্যানার-সাইনবোর্ড ও সিল-প্যাড বানানোর দোকান খুলেছিলেন তিনি। তার দোকানের নাম ছিল রোমান অ্যাড।
দীর্ঘ ২১ বছর পর এই দুর্ধর্ষ জঙ্গির সন্ধান পাওয়া গেল যেভাবে
আলোচিত এই জঙ্গি সদস্যকে গ্রেফতারে নেতৃত্ব দিয়েছেন কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। তিনি জানান, গত বছরের ২৩ মার্চ যখন আলোচিত এই মামলার রায় হয়, তারপর তিনি জানতে পারেন এই ঘটনায় জড়িত পাঁচ জন পলাতক রয়েছে। তখন অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে এদের ধরতে তিনিও কাজ শুরু করেন।
সিটিটিসির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রথমে পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে এই পাঁচ জনের স্থায়ী ঠিকানা সংগ্রহ করি। তারপর শুরু হয় গোয়েন্দা নজরদারি। তথ্য-প্রযুক্তি ও একটি বিশেষ সূত্রের মাধ্যমে প্রথমে আজিজুল হকের স্ত্রীর সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। তারপর ধীরে আজিজকে শনাক্ত করে গ্রেফতার করা হয়।’
সিটিটিসির সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, তারা একটি বিশেষ সূত্রের মাধ্যমে আজিজুলের স্ত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেন। এজন্য আজিজুলের শশুরবাড়ি এলাকায় জমি কেনাবেচার ছদ্মবেশে গোয়েন্দাদের ঘুরতে হয়েছে। পরে আজিজের স্ত্রীর একটি জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া গেলে সেখানে আজিজের নাম দেখা যায়। পরে ধীরে ধীরে খিলক্ষেতে আজিজের দোকানটিও শনাক্ত করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আজিজুল হক নিজের পরিচয় গোপন করে থাকতেন। তার কাছে একটি ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া গেছে, যেটিতে তিনি আবু রোমান সুরুজ নামে বানিয়েছিলেন। তাতে ঠিকানা দেওয়া ছিল নেত্রকোণার কমলাকান্দার শিদলী এলাকা। তবে ২০০৮ সালে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করলেও সেখানে গ্রামের বাড়ির প্রায় আসল ঠিকানাই দেওয়া ছিল। গ্রামের নামটি একটু ওলট-পালট করে দিয়েছিলেন তিনি।
সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান, গাজীপুরের শ্রীপুরে জামিয়া আনোয়ারিয়া মাদ্রাসায় পড়ার সময় সেখানকার এক শিক্ষক মাওলানা আমিরুল ইসলামের মাধ্যমে হুজিতে যোগ দেন। মাওলানা আমিরুল ছিলেন হুজির শীর্ষ জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নানের অনুসারী। কোটালীপাড়ায় যে কয়েকজন নিজ হাতে বোমা পুতে রেখেছিলেন আজিজুল তাদের মধ্যে অন্যতম। পলাতক থেকেও তিনি হুজিবিকে আবারো সক্রিয় করার চেষ্টা করছিলেন।
পুলিশ কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা আজিজুলের কাছ থেকে হুজির নতুন নেটওয়ার্ক সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছি। একই সঙ্গে তার বর্তমান সহযোগী ও আগের সহযোগীদের অবস্থান শনাক্ত ও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।