যানবাহনের শহরে নেই যানজট-হর্ন, ঢাকায় হবে কবে?

যানবাহনের শহর তুরস্ক, ইস্তাম্বুল, লন্ডন। মানুষের সংখ্যা কম নয়। তবে এরপরও নেই যানজট বা হর্ন। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায় পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করেছে শহরগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো। ঠিক সেই আদলে বাংলাদেশের যানজট সমস্যাও সমাধান করা যায় বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তারা বলছেন, এজন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা।

তুরস্কের আঙ্কারা শহরে দেখা গেছে, বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত যানবাহন রয়েছে। শহরটিতে নেই কোনও মেট্রোরেলে ব্যবস্থা। ট্রাফিক সিগন্যালগুলোতেও নেই বাংলাদেশের মতো পুলিশের হাতের ইশারা। সম্পূর্ণ সিগন্যাল বাতির নির্দেশনায় চলছে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ। চালকরা একান্ত বাধ্য না হলে কোনও হর্ন দেন না। যানজট ও যানবাহনের হর্নমুক্ত শহরটি যেন দিনরাত নীরবতা পালন করছে।

শহরের প্রধান প্রধান চৌরাস্তাগুলোতে সিগন্যাল এড়াতে মাটির নিচ দিয়ে শহরের সড়ক সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। কোনও প্রকার সিগন্যালিং ছাড়াই আন্ডারগ্রাউন্ড সড়ক ব্যবহার করে গন্তব্যে পৌঁছা যাচ্ছে। দুই-একটি সড়ক মোড়ে ট্রাফিক থাকলেও তার সিগন্যাল যথাযথ পালন করে চালকরা। রাস্তা ফাঁকা থাকলেও কেউ আইন লঙ্ঘন করে না।

একই অবস্থা দেশটির ১২শ বছরের পুরানো শহর ইস্তাম্বুলের। শহরটিতে ঘনবসতিও রয়েছে। যানবাহনের পরিমাণও অনেক। রয়েছে মেট্রোরেল না থাকলেও শহরের সড়কে ছুটে ছলে ঐতিহ্যবাহী ট্রাম। অত্যন্ত কম খরচে নির্ধারিত গন্তব্য থেকে অন্য গন্তব্যে যেতে পারছে মানুষ। এত সবের মধ্যেও নেই কোনও যানজট বা ট্রাফিক সিগন্যাল।

আঙ্কারার মেয়র মনসুর ইয়াবাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের শহর পুরোটাই পরিকল্পিত। আমরা যে কোনও কাজ করার আগে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করে থাকি। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী অগ্রসর হই।

তিনি আরও বলেন, মানুষ ট্রাফিক আইন তখনই ভাঙে যখন দীর্ঘসময় যানজটে বসে থেকে বিরক্ত হয়ে যায়। আমাদের শহর এমনভাবে গড়ে তুলেছি যাতে মানুষ রাস্তায় চলাচলে বিরক্ত না হয়। যে কারণে সামনে রাস্তা ফাঁকা থাকলেও মানুষ ট্রাফিক আইন ভাঙে না।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঢাকার মেয়র আমাদের সঙ্গে সিস্টার সিটি হিসেবে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আমরা দুই সিটি একে অপরের সঙ্গে সিস্টার সিটি হিসেবে কাজ করবো।

শহরটির একটি গণপরিবহন চালক মো. আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা একান্ত বাধ্য না হলে হর্ন দেই না। এদেশে হর্ন দেওয়া মানে হচ্ছে অপরজনকে ‘গালমন্দ’ করা। যে কারণে কেউই হর্ন দেয় না। তাছাড়া হাইওয়েগুলোতে কোনও ট্রাফিক সিগন্যাল নেই। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে আন্ডারগ্রাউন্ড লাইন করে দেওয়া হয়েছে। যে কারণে বিপুল পরিমাণ মানুষ থাকলেও তাতে যানজট লাগে না।

দেশটির হাইওয়েগুলোতে দেখা গেছে, ডিজিটাল পদ্ধতিতে টোল আদায় করে সরকার। কোথাও ম্যানুয়াল পদ্ধতি নেই। সড়কগুলোর উপরে সিসি ক্যামেরাসহ সেন্সর বসানো রয়েছে। সেন্সরের মাধ্যমে অটো টোল আদায় হয়ে যাচ্ছে।

অপরদিকে দেশটির চালকদের জন্য ডিজিটাল ড্রাইভিং লাইসেন্স রয়েছে। তার সঙ্গে প্রতিটি যানবাহনের সেন্সর যুক্ত রয়েছে। প্রত্যেক চালকের কর্মঘণ্টা ৮ ঘণ্টা করে নির্ধারিত। দূরপাল্লার প্রতিটি যানবাহনে দুজন করে চালক থাকে। একটি ড্রাইভিং লাইসেন্সের অনুকূলে ৮ ঘণ্টা অতিক্রম হলে আর গাড়ি চলে না। তখন অন্য চালককে হাল ধরতে হয়। তাছাড়া প্রতিটি টার্মিনালে চালকদের জন্য বিশ্রামের ব্যবস্থা রয়েছে।

একই চিত্র দেখা গেছে লন্ডনেও। শহরটির ব্যবস্থাপনাও একই। তবে শহরটিতে তিন থেকে চার তলা বিশিষ্ট আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল রয়েছে। তবে বিপুল সংখ্যক মানুষ অল্প সময়েই নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছতে পারেন। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন বাংলাদেশেও ওই পদ্ধতি চালু করা দরকার। এজন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত কিছু পরিকল্পনা।

জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রতিটি শহরের একটা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থাকে। সেই বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করেই পরিকল্পনা করতে হয়। দুর্ভাগ্য আমরা তাতে গুরুত্ব দিইনি। তাছাড়া আমাদের পরিকল্পনা ব্যবস্থাপনায় গণপরিবহনকে উপেক্ষা করা হয়েছে। সড়কগুলোতে কানেকটিভিটি নেই।

তিনি আরও বলেন, উন্নত দেশগুলোতে আমরা দেখতে পাচ্ছি কোনও ফ্লাইওভার নেই। তারা অধিকাংশ ট্রাফিক ইন্টারসেকশনগুলোতে আন্ডারপাসের মাধ্যমে কানেকটিভিটি তৈরি করে। আমরা সেখানে ফ্লাইওভার করছি। এই ফ্লাইওভার আমাদের এসটিপিতে ৬ষ্ঠ নাম্বরে ছিল। সেখানে আমরা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রথমে নিয়ে এসেছি। যানজট নিয়ন্ত্রণে ফ্লাইওভার কার্যকর ব্যবস্থা নয়। আসলে আমাদের পরিকল্পনাই ভুল।

পূর্বাচল নতুন শহরের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে একটি সড়ক করা হচ্ছে। যাতে কোনও ট্রাফিক সিগন্যাল থাকবে না। মূল শহরের মধ্যে ইন্টারসেকশন ম্যানেজমেন্ট প্রয়োজন। সঠিক কর্মপরিকল্পনা থাকলে কোনও সমস্যা হয় না। আমাদের পরিকল্পনায় প্রচুর ভুল রয়েছে। এখনই সময় এসেছে এই শহরকে বাঁচানোর।

তিনি আরও বলেন, গণপরিবহনে শৃঙ্খলার প্রধান শর্ত হচ্ছে উন্নত পাবলিক বাস। কিন্তু ঢাকায় তার কোনও ব্যবস্থা নেই। এখন বাস রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে যা করা হচ্ছে তা যদি বাস্তবায়ন করা না যায় তাহলে তার কোনও উন্নতি হবে না। উন্নত গণপরিবহনের সংখ্যা বাড়াতে হবে।

নগর পরিকল্পনা বিভাগ ও অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই আয়েশা সাঈদ বলেন, চাইলেই আমাদের শহরকে হংকং,লন্ডন বা প্যারিস করা যাবে না। প্রতিটি শহরের একেটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সেদিকেই নজর রেখে পরিকল্পনা করতে হবে। কিন্তু আমাদের পরিকল্পনায় অনেক ঘাটতি রয়েছে। কোনও প্রকার গবেষণা ছাড়াই অনেক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। যা পরবর্তীতে কার্যকর হয় না। ট্রাফিক সিগন্যালিং-এ যেমনটা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এই শহরকে বাসযোগ্য করতে হলে এখনও সময় রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি সঠিক কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে।