বিভিন্ন মার্কেটে তারা ক্রেতা সেজে ওঁৎ পেতে থাকে। ব্যবসায়ীদের দামি পণ্যসামগ্রী রিকশায় করে নিয়ে যাওয়ার সময় চাকা পাংচারের নাটক সাজায় চালক। ঠেলে সামনের দিকে রিকশা যাওয়ার মুহূর্তেই কয়েকজন এসে ধাক্কা লাগার অভিযোগ তুলে ঝগড়া শুরু করে দেয়। ঝগড়ার এক পর্যায়ে রিকশা এবং ব্যবসায়ীর পণ্য সামগ্রী নিয়ে চম্পট দেয় তারা। রিকশাচালকের সহায়তায় রাজধানী থেকে ছিনতাই করে পণ্যসামগ্রী নারায়ণগঞ্জ নিয়ে বিক্রি করতো তারা। এমনই একটি অভিনব ছিনতাইকারী চক্রের ৩ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে নিউমার্কেট থানা পুলিশ।
পুলিশ বলছে, অভিনব এই প্রতারণা ও ছিনতাই চক্রের সদস্যরা রাজধানীতে বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটিয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, রাজধানীর বিভিন্ন শপিং মল কিংবা মার্কেটে অবস্থান নিতো তারা। চক্রের আরেক সদস্য মার্কেট থেকে বের হওয়ার সময় ব্যবসায়ীর সঙ্গে থাকা মূল্যবান সামগ্রীর (যেমন-মোবাইল ও কম্পিউটার সরঞ্জামাদি) ওপর নজর রাখতো। চক্রের অন্য সদস্যরা মার্কেটের সামনে রিকশা নিয়ে অবস্থান করে। দরদাম ঠিক হলে গন্তব্যের দিকে যাওয়া শুরু করে রিকশা। পথে লোক সমাগম কম থাকলে রিকশাওয়ালা চাকা পাংচার নাটক সাজায়। রিকশা ঠেলে সামনের দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় প্রতারক চক্রের অন্যান্য সদস্যরা ধাক্কা লাগার কথা তুলে ব্যবসায়ীর সঙ্গে ঝগড়া শুরু করে দেয়। আর এই ঝগড়াই কাল হয়ে ওঠে ব্যবসায়ীর জন্য। ছিনতাই করা পণ্য রাজধানী থেকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের মার্কেটে বিক্রি করা হতো।
অভিনব এই প্রতারণা ও ছিনতাই চক্রের অন্যতম সদস্য নারায়ণগঞ্জের ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়ী মো. মামুনুর রশিদ। এ চক্রের অন্য সদস্যরা হলো—মো. শাহাদাত হোসেন ও আবুল হাসনাত। কলাবাগান থানা পুলিশ অভিযান পরিচালনা করে নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার পাগলা বাজারসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদেরকে গ্রেফতার করে। এসময় তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৩৩২টি মোবাইল ফোন।
পুলিশ বলছে, মশিউর রহমান নামে এক মোবাইল ব্যবসায়ী গত ১৬ মার্চ দুপুরে রাজধানীর ইস্টার্ন প্লাজা থেকে মোতালেব প্লাজা মার্কেটে ৪৫৭টি মোবাইল রিকশাযোগে কর্মচারীর মাধ্যমে পাঠায়। মালামাল তুলে দোকানের কর্মচারী রিকশার সঙ্গে হেঁটে মোতালেব প্লাজার দিকে এগুচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর অজ্ঞাতনামা দুই ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে রিকশার পাশে থাকা সেই কর্মচারীর সঙ্গে তর্কাতর্কি শুরু করে। এই সুযোগে রিকশাচালক মোবাইল ভর্তি বাকশো নিয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মশিউর রহমান কলাবাগান থানায় মামলা দায়ের করেন। ঘটনার তদন্ত করতে গিয়েই অভিনব প্রতারণা ও ছিনতাইকারী চক্রের ৩ সদস্যকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
পুলিশ বলছে, এই প্রতারণা ও ছিনতাই চক্রে ১০ থেকে ১২ জন সদস্য রয়েছে। তবে তাদের মূল হোতা গ্রেফতার মো. মামুনুর রশিদ। নারায়ণগঞ্জে তার ইলেকট্রনিক্সের দোকান রয়েছে। মোবাইল-কম্পিউটার ছাড়াও অন্য মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে যাওয়ার সময় এভাবেই প্রতারণার মাধ্যমে ছিনতাই করে আসছিল চক্রটি। প্রায় এক বছর ধরে তৎপর রয়েছে চক্রটি। এই চক্রের সঙ্গে রিকশাচালকও জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। রিকশাচালকের সহায়তা ছাড়া তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে মালামাল নিয়ে চম্পট দেওয়া সহজ নয় বলেও জানায় পুলিশ।
মামুনুর রশীদকে গ্রেফতারের বিষয়ে বলতে গিয়ে পুলিশ জানায়, ছিনতাই করে নিয়ে যাওয়া মোবাইলগুলোর আইএমইএ নাম্বার ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে প্রথমে এক খুচরা বিক্রেতার সন্ধান পাওয়া যায়। সেই খুচরা বিক্রেতার লোকেশন পাওয়া যায় নারায়ণগঞ্জে। মামুন নারায়ণগঞ্জের একজন বড় মোবাইল ব্যবসায়ী। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার বাংলাবাজারে এসব ছিনতাই করা মোবাইলগুলো বিক্রি করতো। মোবাইল ব্যবসার আড়ালে সে এ ধরনের অভিনব প্রতারণা ও ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত। সে এই প্রতারণা এবং ছিনতাইয়ের চক্রটি পরিচালনা করে আসছে বলে জানায় পুলিশকে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) নিউমার্কেট জোনের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার শরীফ মোহাম্মদ ফারুকুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গ্রেফতার তিন জনের কাছ থেকে আমরা চোরাই মোবাইল উদ্ধার করেছি। রিকশাচালকদের জড়িত থাকার বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি। এসব বিষয় আমরা খতিয়ে দেখছি।
তিনি বলেন, এই চক্রের আরও কয়েকজন সদস্যদের নাম আমরা পেয়েছি। তাদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।