লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে পাওয়া যাবে প্রতি মাসে দুই হাজার টাকা। আর এফডিআর করলে চলমান প্রজেক্টে হওয়া যাবে একটি ফ্ল্যাটের মালিক। নিম্ন আয়ের লোকজনকে টার্গেট করে এভাবে স্বপ্ন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিতো সমবায় সমিতিগুলো। পরে তারা আত্মগোপনে চলে যেত। সম্প্রতি র্যাবের বেশ কয়েকটি অভিযানে এসব সমিতি পরিচালনাকারীদের গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে এ তথ্য পাওয়া গেছে। র্যাব বলছে, আইনানুগ ব্যবস্থা চলমান রেখে প্রতারক চক্রের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
র্যাব জানায়, সমবায় সমিতির নামে এসব প্রতারক চক্র নিম্ন আয়ের মানুষ বিশেষ করে গার্মেন্টসকর্মী, রিকশা-ভ্যানচালক, অটোরিকশাচালক সবজি ব্যবসায়ী, ফল ব্যবসায়ীদের টার্গেট করতো। তাদের বুঝিয়ে বিভিন্ন ভুয়া প্রকল্প যেমন: ডিপিএস, এফডিআর, পেনশন পলিসি, ডেইরি ফার্ম, ফ্ল্যাট ইত্যাদি দেখিয়ে উচ্চ মুনাফার প্রলোভনে নগদ অর্থ হাতিয়ে নিতো। ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতো। তারা শরিয়াহ লেনদেনের কথা বলতো।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, সম্প্রতি রাজধানীসহ আশপাশের এলাকা মানিকগঞ্জ, সাভার ও আশুলিয়ায় বেশ কয়েকটি সমবায় সমিতি গ্রাহকের টাকা হাতিয়ে নিয়ে আত্মগোপন করে। পরে বিভিন্ন ছায়া তদন্ত এবং অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান শুরু করে র্যাব। অভিযোগের ভিত্তিতে মুনলাইট ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড, পল্লী উন্নয়ন সমিতি লিমিটেড, শিবপুর ক্ষুদ্র ঋণ দান কোঅপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড, ফাল্গুনী ডটকম, কর্ণফুলী মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড নামের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালায় র্যাব। সর্বশেষ গত ২৩ মার্চ চেতনা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির নামে আশুলিয়ায় গড়ে ওঠা সমবায় সমিতির ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
কয়েকটি সমবায় সমিতির কার্যালয়ে অভিযান পরিচালনার পর র্যাব কর্মকর্তারা জানতে পারেন, অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে এবং ভবিষ্যতে আবাসন ঘরের স্বপ্ন দেখিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে এসব সমিতির মালিকরা। তাদের সমিতিতে বিনিয়োগ করে ৪০০-৫০০ সদস্যা এখন প্রায় নিঃস্ব। বিনিয়োগের টাকা উঠিয়ে নিতে চাইলে তাদের ভয়-ভীতি দেখানো হতো। এসব সমবায় সমিতির থাকতো নিজস্ব পেটোয়া বাহিনীও।
প্রতারণার কৌশল হিসেবে মানিকগঞ্জের অনুমোদনহীন মুনলাইট ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি ও পল্লী উন্নয়ন সমিতির গ্রেফতার সভাপতিসহ দুজন র্যাবকে জানায়, সাধারণ মানুষকে বোঝানো হতো দৈনিক ২০০-৩০০ টাকা জমা করে সঞ্চয়ী গ্রাহক হতে হবে। নিয়মিত টাকা জমাতে পারলে, পাওয়া যাবে ঋণ। সেইসঙ্গে জমানো টাকার ওপর জেলার দৌলতপুর থানা শহরে একটি করে ফ্ল্যাট বা জমির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো সমিতির পক্ষ থেকে। পল্লী উন্নয়ন সমবায় সমিতি নামে ২০০৯ সাল থেকে এটির কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও পরে গ্রেফতার সভাপতি রবিউল আলম ওরফে আদম সমিতির নাম পরিবর্তন করে প্রতারণার উদ্দেশে মুনলাইট ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি নাম দেয়। নাম পরিবর্তনের পর প্রতারণার মাধ্যমে ১২ বছরে প্রায় দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে সমিতি।
এসব ভুয়া কিংবা লাইসেন্সবিহীন সমবায় সমিতিগুলো প্রতারণার কৌশল নিয়ে সর্বস্বান্ত করে আসছে সাধারণ মানুষকে। একেকটি সমবায় সমিতির ১০ থেকে ১২ বছর ধরে এ ধরনের প্রতারণার সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে র্যাব। এসব সমিতির প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং কার্যক্রম না থাকলেও তারা ব্যাংকিং কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। এছাড়া মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি আর্থিক লেনদেনের জন্য অনুমোদন ছিল না এসব সমিতির। বিভিন্ন ব্যাংকের নামে অনুমোদনহীন পাস বই তৈরির মাধ্যমে আদায় করা হতো গ্রাহকদের টাকা। যা ছিল তাদের প্রতারণার অন্যতম কৌশল। এছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ছিল না কোনও ব্যাংক অ্যাকাউন্টও। নিজেদের নিজস্ব অ্যাকাউন্টে পরিচালিত হতো অর্থ লেনদেন।
নিজেদের জমানো ২৫ লাখ টাকা চেতনা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডে বিনিয়োগ করে এখন নিঃস্ব আশুলিয়ার গার্মেন্টসকর্মী নাজমুল ইসলাম। তারা মাসে মাসে জমিয়ে এসব টাকা সঞ্চয় করেন চেতনা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডে। হতাশা নিয়ে এবং কান্নজড়িত কণ্ঠে নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘নিজেদের কষ্টে অল্প অল্প করে ২৫ লাখ টাকা জমাই। যা চেতনা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটিতে রাখা হয়। আমাদের আশ্বাস দেওয়া হয়, ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে, সেখান থেকে একটি ফ্ল্যাট পাবো। এই সাইটের প্রলোভন দেখিয়ে আমাদের ২৫ লাখ টাকা এফডিআর করতে বলা হয়। আমরাও একটি ফ্ল্যাট পাওয়ার আশায় টাকা এফডিআর করি। এখানে আমার পরিবারের জমি বিক্রির টাকা রয়েছে। এখন আমি একেবারে নিঃস্ব।
সমবায় সমিতিতে ৫৬ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রফিকুল। তার পুরো টাকাই এখন প্রতারক চক্রের পকেটে। ফিরে পাবে কিনা এ নিয়েও দিন দিন সন্দেহ দানা বাঁধছে তার মনে। কী করবেন কিছুই ভেবে পাচ্ছেন না। বিভিন্ন সময় ব্যবসার টাকা, পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের টাকা, জমি বিক্রি এবং এফডিআর থেকে মুনাফার টাকা যুক্ত হয়ে ৫৬ লাখ টাকা বিনিয়োগ ছিল চেতনা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটিতে।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিভিন্ন সময় সমবায় সমিতির পরিচালনা কমিটির প্রতারক চক্রের যে সদস্যদের আমরা গ্রেফতার করছি, তাদের বিভিন্ন অর্থ-সম্পদের তথ্য আমরা পাচ্ছি। এ পর্যন্ত যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে সেসব সমিতির পরিচালনা কমিটির সবারই একাধিক বহুতল ভবন রয়েছে। সাধারণ মানুষকে প্রতারণা করে বিভিন্নভাবে উচ্চ মুনাফা দেওয়ার নামে ফিক্সড ডিপোজিট করাতো তারা। প্লট বা ফ্ল্যাট দেওয়ার নামে গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে সে টাকা আত্মসাৎ করতো।’
তিনি বলেন, ‘গ্রেফতার ব্যক্তিরা বিদেশে অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত কিনা এ বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইসলামিক শরিয়াহ কথা বলে হজে যাওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। হজে যাওয়া অনেক ব্যক্তিও এখানে টাকা দিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন।’