ইএএলজি প্রকল্পের সুফল: নাগরিকের দুয়ারে জনপ্রতিনিধি

স্থানীয় সরকার আইন অনুযায়ী গঠিত ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদ। এ দুটি পরিষদ পরিচালনায় আইনে অনেক বিধান এবং নির্দেশনার উল্লেখ থাকলেও তার বাস্তবায়নে ‘দুর্বলতা’র কথা প্রায়শই শোনা যায়। আইনে থাকলেও পরিকল্পনা প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অনেক ক্ষেত্রে নাগরিকদের অংশগ্রহণ থাকে না। অবশ্য দেশের বেশ কয়েকটি উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদে এর ব্যতিক্রমও দেখা যায়।

স্থানীয় সরকার ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী প্রতিটি পরিষদের জন্য আবশ্যকীয় কিছু কাজ রয়েছে। এরমধ্যে পরিষদ সভা, ওয়ার্ড সভা, ওয়ার্ড পর্যায়ে উন্মুক্ত বাজেট সভা, স্থায়ী কমিটি গঠন ও সভা আয়োজন এবং গণশুনানির আয়োজন করা। আইন এবং বিধিতে এসব বিষয়ের জন্য নির্ধারিত কর্মপরিধিও রয়েছে। কিন্তু জনপ্রতিনিধিদের অনেকের আইন এবং বিধি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণাও নেই।

আশার কথা হলো, জনপ্রতিনিধিদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইউএনডিপি, সুইজারল্যান্ড এবং ডেনমার্কের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক স্থানীয় সরকার (ইএএলজি) প্রকল্পের আওতায় বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এজন্য পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে দেশের আটটি বিভাগের ৯টি জেলার পিছিয়ে পড়া ১৮টি উপজেলা পরিষদ ও ২৫১টি ইউনিয়ন পরিষদকে বেছে নেওয়া হয়েছে।

ইএলজিএ (1)

জেলাগুলো হচ্ছে- ফরিদপুর, চাঁদপুর, রাজশাহী, খুলনা, পটুয়াখালী, সুনামগঞ্জ, রংপুর, নেত্রকোনা ও কক্সবাজার। প্রকল্পের তিনটি কম্পোনেন্ট হচ্ছে- সেবার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে উপজেলা পরিষদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা; অংশগ্রহণমূলক স্থানীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে ইউনিয়ন পরিষদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং কার্যকর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় নীতি প্রণয়ন ও সংস্কারে স্থানীয় সরকার বিভাগকে সহায়তা করা।

ছবি: ইউএনডিপির ওয়েবসাইট থেকে

জানা গেছে, রাজশাহী জেলার ৩০টি ইউনিয়ন ও দুইটি উপজেলা পরিষদকে প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে। এরমাধ্যমে পরিষদগুলোতে নিয়মিত গণশুনানি, পরিষদের স্থায়ী কমিটির সভা আয়োজন, জলবায়ু পরিবর্তন ও জেন্ডার বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি, উন্মুক্ত বাজেট সভা আয়োজন, পরিষদের সঙ্গে স্থানীয় মেয়ে শিক্ষার্থীদের সংলাপ অনুষ্ঠান, উপজেলা পরিষদের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ, উপজেলা পরিষদ কমিটি সদস্যদের প্রশিক্ষণ প্রদান, ওয়ার্ড সভা আয়োজন, ইউনিয়ন পরিষদের কর ধার্য ও আদায়ে সহায়তাকরণ, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের এসডিজি বান্ধব পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন, এসডিজি বিলবোর্ড স্থাপনসহ নানা কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। এসব কর্মসূচির কারণে ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে সেবার মানের পরিবর্তন এসেছে। স্থানীয় নাগরিকরা তাদের পরিষদ কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও বিস্তারিত জানতে পারছেন।

আইন অনুযায়ী প্রত্যেক ইউনিয়ন পরিষদ প্রতি অর্থবছর শুরু হওয়ার অন্যূন ৬০ দিন আগে নির্ধারিত পদ্ধতিতে ওয়ার্ড সভা হতে প্রাপ্ত তথ্যের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে উক্ত অর্থ বছরের সম্ভাব্য আয় ও ব্যয় বিবরণী সম্বলিত একটি বাজেট প্রণয়ন করবে। ইএএলজি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রকল্পভুক্ত এলাকাগুলোতে ওয়ার্ড সভার ও বাজেট সভার আয়োজন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিরা প্রতিটি ওয়ার্ডের নাগরিকদের মতামত পাচ্ছেন। এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটি এবং স্থানীয় জনসাধারণের উপস্থিতিতে প্রকাশ্য বাজেট অধিবেশন অনুষ্ঠান করে বাজেট পেশ করছে। পরিষদের পরবর্তী সভায় পাসকৃত বাজেটের অনুলিপি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে পাঠানো হচ্ছে।

ইএলজিএ (2)

একাধিক ইউনিয়ন পরিষদ সূত্র জানিয়েছে, এক সময় ঘরে বসেই পরিষদের উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করতেন চেয়ারম্যান ও সদস্যরা। সাধারণ নাগরিকরা তার কিছুই জনতো না। প্রকল্প বাস্তবায়ন না করেও অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হতো। কিন্তু এখন সেই দৃশ্য বদল হচ্ছে।

প্রকল্পের আওতায় রাজশাহী জেলার ৩০টি ইউনিয়ন পরিষদের ২৭০টি ওয়ার্ড সভা করা হয়েছে। এছাড়া সাতটি ইউনিয়ন পরিষদে গণশুনানির আয়োজন করা হয়েছে। গণশুনানিতে ৯৯টি ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে। এরমধ্যে ১৬টি তাৎক্ষণিক সমাধান করা হয়েছে। পাশাপাশি জেলার বাগমারা ও মোহনপুর উপজেলায়ও দুটি গণশুনানি করা হয়।

শুনানিতে অংশ নিয়ে বয়স্ক ভাতা পেয়েছেন গড়গড়ি ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের বামনডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা জামেনা খাতুন। স্বামী আব্বাস আলীর মৃত্যুর পর বয়স্ক ভাতা পেতেন তিনি। গত বছর তিনি কোনও ভাতা পাননি। ইউনিয়নের গণশুনানিতে তিনি উপস্থিত হয়ে তার সমস্যা উত্থাপন করলে চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম তাৎক্ষণিক উপজেলা সমাজসেবা অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার ভাতার ব্যবস্থা করেন। তথ্য হালনাগাদ না থাকায় উক্ত নারীকে মৃত বিবেচনা করে তার নাম বয়স্কভাতার তালিকা থেকে বাতিল করা হয়েছিল। গত বছরের ৬ ডিসেম্বর উপজেলা সভায় তার ভাতা পুনরায় চালু করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

স্থানীয় সরকার আইন অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক গৃহীত সকল উন্নয়ন পরিকল্পনা ওয়ার্ডসভায় উপস্থিত স্থানীয় জনগণের মতামতের ভিত্তিতে গ্রহণ করার নির্দেশনা রয়েছে। আইনগণ বাধ্যবাধকতা থাকায় ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে নামমাত্র ওয়ার্ডসভা আয়োজনের প্রচলন ছিল। ইউনিয়ন পরিকল্পনায় ও উন্নয়ন কার্যক্রমে স্থানীয় জনগণের মতামতের প্রতিফলন ছিল সামান্য।

ইএলজিএ (3)

জানা গেছে, ওয়ার্ডসভার কারণে ওয়ার্ডের সকল ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা স্থানীয় জনগণের মতামতের ভিত্তিতে হয়ে থাকে। স্থানীয় জনগণ বিগত বছরে ওয়ার্ডে কী কী কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে, কত টাকা ব্যয় হয়েছে তার তথ্য জানতে পারে। সকল প্রকার সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর উপকারভোগীর নাম ওয়ার্ড সভা থেকে প্রস্তাবিত হয়। তাতে ইউনিয়নের বার্ষিক পরিকল্পনা করা সহজ হয়।

প্রকল্পটির মাধ্যমে প্রকল্পভুক্ত এলাকাগুলোতে ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদগুলোতে বার্ষিক বাজেট প্রণয়নের পাশাপাশি প্রকল্পগুলোর বিস্তারিত তথ্য বিল বোর্ডের মাধ্যমে পরিষদের সামনে উন্মুক্ত স্থানে লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে স্থানীয় নাগরিকরা তাদের এলাকার জন্য গ্রহণ করা প্রকল্পগুলোর বিস্তারিত তথ্য জানতে পারছেন।

জানতে চাইলে রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সাঈদ আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এক সময় আমাদের ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে কোনও ওয়ার্ড সভা হতো না। চেয়ারম্যান মেম্বাররা একটা বাজেট তৈরি করে পাশ করে নিতো। নিজেরাই মুখস্থ রেজুলেশন বানিয়ে পরিষদ চালাতো। এখন প্রতিটি ওয়ার্ডে এক দুটি করে ওয়ার্ড সভা করা হয়। নাগরিকদের মতামত নেওয়া হয়। তাদের চাহিদার ভিত্তিতে উন্নয়ন কাজের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।

ছবি: ইউএনডিপির ওয়েবসাইট থেকে

ইউনিয়নটির ২নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা নাছিমা আক্তার বলেন, আগে চেয়ারম্যান-মেম্বাররা নির্বাচিত হওয়ার পর আর কখনও আমাদের দুয়ারে আসতেন না। এখন বছরে অন্তত ওয়ার্ডে দুইটি করে সভা হয়। সভায় আমরা মতামত দিতে পারি। আমাদের মহল্লাবাসীর মতামতের ভিত্তিতে এলাকায় কয়েকটি প্রকল্পও গ্রহণ করেছেন।

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা ১৩নং গোয়ালকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের গিয়ে দেখা গেছে, পরিষদের সামনে ২০২০-২১ অর্থবছরে এলজিএসপি-৩ এর ১২ লাখ ৪৪ হাজার ২৪৭ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত ৮টি প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি একই অর্থবছরের জন্য গ্রহণ করা ১ কোটি ৬২ লাখ টাকার বাজেটের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। তাতে পরিষদের আয় ও ব্যয়ের বিস্তারিত বিবরণী রয়েছে।

জানতে চাইলে পরিষদের চেয়ারম্যান আলমগীর সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ইএএলজি প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা অনেক কিছু শিখতে পেরেছি। প্রকল্পের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড সভা, উন্মুক্ত বাজেট সভা, গণশুনানিসহ বেশ কিছু কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আইনে থাকলেও এগুলো আগে কোনও পরিষদে বাস্তবায়িত হতো না। এখন এর মাধ্যমে নির্বাচনের পরে প্রত্যেক জনপ্রতিনিধি তার ভোটারের কাছে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা প্রতিটি ওয়ার্ডে দুটি করে ওয়ার্ড সভা করে থাকি। তাতে অন্তত ২ থেকে ৫ শতাধিক মানুষ উপস্থিত থাকে। সভায় জনগণের চাহিদা অনুযায়ী পরিষদের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পসহ অন্যান্য কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করি। নাগরিকদের অভিযোগের জবাব সামনা-সামনি দিতে পারছি। ফলে কোনও জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার পর তার ভোটারদের থেকে দূরে চলে যাবে সেই সুযোগ নেই। এছাড়া মানুষ নাগরিকের চাহিদা অনুযায়ী রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা, দারিদ্র্য রোধ, স্বাস্থ্য সম্মত স্যানিটেশন, কৃষকের চাহিদা ও কৃষি খাতের উন্নয়নসহ নানা বিষয়ের উন্নয়ন ঘটানো যাচ্ছে।