‘অনৈতিক কার্যকলাপের প্রতিবাদ করায় খুন হন নায়ক সোহেল চৌধুরী’

বনানী মসজিদের পাশে ট্রাম্পস ক্লাবে উচ্চ শব্দে গান ও অনৈতিক কার্যকলাপের প্রতিবাদ করেছিলেন নায়ক সোহেল চৌধুরী। এজন্য ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা আজিজ মোহাম্মদ ভাই, বান্টি ইসলামসহ সবাই সোহেল চৌধুরীকে উচিত শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন। এমনকি আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে এ নিয়ে সোহেল চৌধুরীর হাতাহাতিও হয়। এরপর তাকে হত্যার দায়িত্ব দেওয়া হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন চৌধুরীকে।

বুধবার (৬ এপ্রিল) দুপুরে র‌্যাবের মুখপাত্র খন্দকার আল  মঈন এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান। এর আগে মঙ্গলবার (৫ এপ্রিল) রাতে রাজধানীর গুলশান থেকে সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলার অন্যতম আসামি আশিষ রায় চৌধুরীকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। তার বিরুদ্ধে আদালতের পরোয়ানা ছিল। গ্রেফতারের পর রাতভর র‌্যাব তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

গ্রেফতারকৃত আশীষ রায় চৌধুরী একাধিক বেসরকারি এয়ারলাইনসের ঊর্ধ্বতন পদে ছিলেন। সর্বশেষ তিনি জিএমজি এয়ারলাইনসের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) ছিলেন।

সোহেল চৌধুরীকে হত্যার নেপথ্যের কারণ

বনানীর মসজিদ কমিটির লোকজন বিভিন্ন সময় ওই ক্লাবে গিয়ে উচ্চ শব্দে গান বাজানোর প্রতিবাদ করতেন। সোহেল চৌধুরীও তাদের সঙ্গে গিয়ে প্রতিবাদ করতেন।  আজিজ মোহাম্মদ ভাই, বান্টি ইসলাম ও আশিষ রায় চৌধুরীর ধারণা ছিল ক্লাব ব্যবসা বাধাগ্রস্ত করতে সোহেল চৌধুরীর ইন্ধনে মসজিদ কমিটি এসব করছে।

২৪ বছর ধরে আসামি আশিষ রায় চৌধুরী পলাতক ছিলেন। গ্রেফতারের পর  জিজ্ঞাসাবাদে আশিষ জানান, তিনি ও বান্টি ইসলাম বাল্যকাল থেকে বন্ধু। ১৯৯৬ সালে আবেদীন টাওয়ারে তারা দুজনে ট্রাম্পস ক্লাবটি করেন। সেখানে বিভিন্ন অনৈতিক কাজ হতো। ক্লাবে আজিজ মোহাম্মদ ভাইর অনুসারী ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আনাগোনা ছিল। বান্টি ইসলাম ছিল আজিজ মোহাম্মদের ভাতিজির স্বামী। বিভিন্ন অপকর্মের পরিকল্পনা হতো এই ক্লাবে।

র‌্যাবের মুখপাত্র খন্দকার আল  মঈন  বলেন, ‘১৯৯৮ সালের ২৪ জুলাই এই ক্লাবে আজিজ মোহাম্মদের সঙ্গে সোহেল চৌধুরীর বিভিন্ন ইস্যুতে বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতি হয়। এজন্য আজিজ মোহাম্মদ ভাই ও বান্টি ইসলাম সোহেল চৌধুরীকে শিক্ষা দিতে চান। এজন্য শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।’

র‌্যাবের কর্মকর্তা বলেন, ‘১৯৯৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর দিবাগত শেষ রাতে সোহেল চৌধুরী গুলশানের ট্রাম্পস ক্লাবে যান। তখন সেখানে আগে থেকেই অবস্থান করছিল শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনসহ অন্যরা। সেখানে আদনান সিদ্দিকীও ছিল। তারা   ট্রাম্পস ক্লাবের নিচে নায়ক সোহেল চৌধুরীকে গুলি করে হত্যা করে। এই ঘটনায় আরও  কয়েকজন আহত হন। ঘটনার পর সন্ত্রাসীরা আত্মগোপনে চলে যায়।’

র‌্যাবের হেফাজতে আশিষ রায় চৌধুরীমামলা ও বিচার

এই ঘটনায় নিহত সোহেল চৌধুরীর ভাই একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরে মামলাটি ডিবি  তদন্ত করে। সাধারণ মানুষ ঘটনাস্থল থেকে আদনান নামে একজনকে আটক করে পুলিশে দেয়। আদনানকে এজাহারে  আসামি করা হয়।

১৯৯৯ সালে ৩০ জুলাই আদনানসহ ৯ জনকে আসামি করে ডিবি পুলিশ এই মামলার চার্জশিট দেয়। ২০০১ সালে ৩০ অক্টোবর মামলার অভিযোগ গঠন করা হয়।

আদালতে অভিযোগ গঠনের দুই বছর পর মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। ২০০৩ সালের ১৯ নভেম্বর আসামি আদনান সিদ্দিকী মামলার কার্যক্রম স্থগিত করার জন্য উচ্চ আদালতে একটি রিট করেন। তখন মামলাটি তিন মাস স্থগিত ছিল। ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফের মামলা স্থগিত করা হয়।

২০১৫ সালে উচ্চ আদালতে এই মামলার স্থগিত আদেশ খারিজ করা হয়। এরপর মামলাটির কার্যক্রম পুনরায় নিম্ন আদালতে শুরু হয়।

আসামিরা কে কোথায়?

মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামিদের মধ্যে হারুন অর রশীদ ওরফে লেদার লিটন ওরফে বস লিটন, তারেক সাঈদ মাহমুদ কারাগারে, আজিজ মোহাম্মদ ভাই ব্যাংককে পলাতক, আদনান সিদ্দিকী মেডিক্যাল গ্রাউন্ডে জামিন নিয়ে আমেরিকায় পলাতক, সেলিম খান পলাতক, বান্টি ইসলাম কানাডায় পলাতক, কিছুদিন আগে ফারুক আব্বাসি  গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে কারাগারে রযেছে। আশিষ রায় চৌধুরীকে র‌্যাব গ্রেফতার করেছে। শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন এই মামলার আসামি, সেও বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। পলাতক সবার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে।