‘চাকরি করতাম ঢাকায়। প্রথম সন্তান হওয়ার পরে সিদ্ধান্ত নিই- তার বাবার কর্মস্থল কুমিল্লায় চলে যাওয়ার। সে এক ভীষণ টানাপড়েনের সময়। একা হাতে সন্তান পালন। কিন্তু নিজে কিছু করার তাগিদটাও ছিল মনে। কাজ শুরু করলাম কুমিল্লা খাদি নিয়ে। অনলাইন পেজ খুলে একটা দুটা নিজে ডিজাইন করা শাড়ির ছবি পোস্ট আপলোড করতে বেশ সাড়াও মেলে। এরপর অনলাইনের অন্য উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যোগোযোগ। সেই সুবাদে কুমিল্লা থেকে ঢাকায় নানান মেলায় অংশ নিতে আসা।'
ধানমণ্ডি ২৭ নম্বরের মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত মেলায় অংশ নিয়ে নিজের উদ্যোগের গল্প বলছিলেন এক নারী উদ্যোক্তা। তার মতো আরও ৬৩ জন উদ্যোক্তা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন মেলায়। নিয়মিত যারা তাদের ফেসবুক পেজ কিংবা ওয়েবসাইট ফলো করেন তারা এসেছেন মেলায়। দুই দিনব্যাপী এই মেলা যেন হয়ে উঠেছে ক্রেতা-বিক্রেতার মিলন মেলা।
মেলায় অংশ নেওয়া আরেক নতুন উদ্যোক্তা শোনালেন তার গল্প। তিনি বলেন, ‘পড়াশোনা শেষ করার পরপরই আমার বিয়ে হয়। চাকরিতে ঢোকা হয়নি। এরপর দুই সন্তানের জন্ম, তাদের একটু বড় হতে হতেই কেটে গেল ১০টা বছর। এখন নিজের জন্য কিছু করতে চাই। পরে ভেবে দেখলাম, আমি যেটা ভালো পারি সেটা সবার কাছে পৌঁছে দিলে কেমন হয়। কাজ শুরু করলাম আচার নিয়ে। ভালো সাড়াও পেলাম। আমার কাজটা করতে দুজন সহকারীকেও কাজ দিতে পেরেছি। পরিসর বড় হবে আশা করি। মেলায় প্রথম যেবছর যোগ দিলাম সেইবছরর অন্য উদ্যোক্তাদের জীবনের গল্প, তাদের আত্মবিশ্বাস; আমাকে কাজটা ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।’
মাইডাস সেন্টার ক্রমেই নারী উদ্যোক্তাদের মেলার জন্য পরিচিত হয়ে উঠেছে। করোনাকালে গড়ে ওঠা অসংখ্য অনলাইন উদ্যোক্তারা নিজেরা এক হয়ে তৈরি করেছেন বেশকিছু প্ল্যাটফর্ম। সেসব প্ল্যাটফর্ম থেকেই তারা আয়োজন করছেন একের পর এক মেলা। এই ভেন্যুতেই গত এক মাসে এরকম দুটি প্ল্যাটফর্মের মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সাধারণত শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে আয়োজন করা হয় এসব মেলা। আয়োজকরা বলছেন, মেলায় বিক্রিতো হয়ই, তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ সামনাসামনি কাজের মান দেখে তাদের অনলাইন পেজেও নতুন করে অনেক ক্রেতা যুক্ত হন। পরে অর্ডার করবেন বলে অনেকে যোগাযোগের ঠিকানাও নিয়ে যান। আর উদ্যোক্তাদের নিজেদের মধ্যেও একটা আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়।’
গত মার্চ মাসে ‘জলরঙ’ নামে উদ্যোক্তাদের একটি প্লাটফর্ম মেলার আয়োজন করে। এই মাসের শুরুতে ‘হার ই-ট্রেড’ নামে আরেকটি ফেসবুকভিত্তিক একটি প্ল্যাটফর্ম ৬৩ জন নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে আয়োজন করে ঈদ ও বাংলা বর্ষবরণ মেলা। মেলায় কী ছিল না- জামদানি শাড়ি, জুতা, মাস্ক এবং ধাতব-কাঠ-মাটি-সিরামিকের গয়না। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নকশী কাঁথা, শাড়ি, সালোয়ার-কামিজও ছিল মেলায়।‘
মেলায় আসলে কী হয় প্রশ্নে উদ্যোক্তারাও একইরকম কথা বলেন। তনুশ্রী হালদার নামে এক উদ্যোক্তা বলেন, ‘দেখেন, আমি পণ্য অনলাইনে বিক্রি করি। মেলায় কেবল বিক্রি হবে বলে না, ক্রেতাদের সামনাসামনি পাওয়া, প্রতিক্রিয়া দেখা অনেক বড় ব্যাপার। একইসঙ্গে অন্য উদ্যোক্তাদের কাজ দেখছি। সবার আলাদা আলাদা স্ট্রাগল আছে। সেগুলো আমাকে উৎসাহিত করবে আগামী দিনগুলোতে।’
হার ই-ট্রেড-এর প্রেসিডেন্ট খানম প্রীতি বলেন, যেকোনও প্রদর্শনীর মূল লক্ষ্য পণ্য বিক্রি নয়। আমরা মেলার আয়োজন করেছি নেটওয়ার্কিংয়ের কথা মাথায় রেখে। ধরুন আমাদের পেজে আছেন ৪০ হাজার ফলোয়ার; এটাই বাংলাদেশ না। ফলে যারা কাজ করছেন, তাদের কাজগুলো দেখানো জরুরি। যে কেউ যেন পরবর্তী সময়ে মনে রাখতে পারেন, চিনতে পারেন- যে এই জিনিস ওই পেজে পাওয়া যায়, এই বিশেষ পণ্য নিয়ে অমুক ব্যক্তি কাজ করেন। ফলে প্রদর্শনীর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে।