করোনার টিকা বাবাদ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দেওয়া ব্যয়ের হিসাবে অসঙ্গতি পেয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। মঙ্গলবার (১২ এপ্রিল) ‘করোনা ভাইরাস সংকট মোকাবিলায় সুশাসন: অন্তর্ভুক্তি ও স্বচ্ছতার চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানটি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান। টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শাহজাদা এম আকরামের তত্ত্বাবধানে প্রণীত গবেষণাটি উপস্থাপন করেন একই বিভাগের রিসার্চ ফেলো মো. জুলকারনাইন ও রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট কাওসার আহমেদ। গবেষক দলের অপর সদস্য হলেন একই বিভাগের রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট রাবেয়া আক্তার কনিকা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের সমন্বয়ক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।
গবেষণার তথ্য তুলে ধরে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘কোভিড মোকাবিলায় ব্যয় সম্পর্কিত কিছু তথ্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোটাদাগে উল্লেখ করলেও সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। সরকারি সূত্রে তথ্যের অনুপস্থিতিতে নির্ভরযোগ্য অন্য সূত্রে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আমরা দেখেছি যে, ক্রয়সহ সার্বিক টিকা কার্যক্রমে খরচ হওয়ার কথা ১৩ থেকে ১৭ হাজার কোটি টাকার মতো। যেখানে মন্ত্রী বলেছেন খরচ হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। এই তারতম্যের প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রকৃত ব্যয়ের তথ্য উন্মুক্ত না করার পেছনে তথ্যের অবাধ প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা ও গোপনীয়তার সংস্কৃতির পাশাপাশি সম্ভাব্য অনিয়ম-দুর্নীতি আড়াল করার প্রয়াসও অন্তর্নিহিত কি-না’
কোভিড অতিমারি মোকাবিলায় মোটাদাগে বাংলাদেশ সফল হলেও সুশাসনের আঙ্গিকে, বিশেষত অন্তর্ভুক্তি ও স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে, ঘাটতি রয়েছে উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘জাতীয় টিকা কার্যক্রম পরিকল্পনায় দুর্গম স্থানে বসবাসরত জনগোষ্ঠী, বয়স্ক নাগরিক, সুবিধাবঞ্চিত মানুষ এবং ভাসমান জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় গিয়ে টিকা দেওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে এ লক্ষ্যে উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম দেখা যায়নি। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর টিকাপ্রাপ্তির হার ৪৫ শতাংশর মতো, যা জাতীয় পর্যায়ে অর্জিত ৭৫ শতাংশের তুলনায় অনেক কম, বিষয়টি উদ্বেগের। তা ছাড়াও, টিকা নিতে গিয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষ বৈষম্য, অবহেলা ও দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনার ক্ষেত্রে সরকারের উদ্বুদ্ধকরণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ঘাটতিও লক্ষ করা গিয়েছে।’
কোভিড-১৯ মোকাবিলায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ, নির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্তি ও স্বচ্ছতার চ্যালেঞ্জ উত্তরণে টিআইবি ১০ দফা সুপারিশ করেছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো—টিকা প্রাপ্তির উৎস, ক্রয়মূল্য, বিতরণ ব্যয়, মজুত ও বিতরণ সম্পর্কিত তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত করতে হবে; কোভিড-১৯ চিকিৎসা ও টিকা সম্পর্কিত সব প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ নিরসন ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে এবং অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; কোভিড-১৯ চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নয়নে সরকারি ও প্রকল্পের বরাদ্দ যথাযথভাবে দ্রুততার সঙ্গে কাজে লাগিয়ে প্রতিটি জেলায় আইসিইউ শয্যা, আরটি-পিসিআর পরীক্ষাগারসহ অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন শেষ করতে হবে; বেসরকারি পর্যায়ের অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে টিকার আওতার বাইরে রয়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের চিহ্নিত করে টিকার আওতায় আনতে হবে; প্রথম ডোজ পাওয়া বিশেষত নিবন্ধনহীন টিকাগ্রহীতাদের দ্বিতীয় ডোজ নিশ্চিত করতে প্রচারণা বৃদ্ধি করতে হবে; মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দফতর, প্রতিষ্ঠান, গবেষক, উদ্যোক্তা সমিতির সহায়তায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের চিহ্নিত করে তাদের মধ্যে প্রণোদনা ঋণ আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কিত তথ্য প্রচার করতে হবে ইত্যাদি।