দেশে মুক্তচিন্তার পরিসর সংকুচিত হচ্ছে: মহিলা পরিষদ

সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও উসকানিমূলক ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে গ্রেফতার ও যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সোমবার (২৫ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় সংগঠনটির সুফিয়া কামাল ভবন মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে মডারেটর হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। এতে সংগঠনের পক্ষে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি রেখা চৌধুরী।

লিখিত বক্তব্যে রেখা চৌধুরী বলেন, ‌‘আমরা সবাই বাঙালি—এই চেতনার আলোকেই ১৯৭১ সালে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসহ সব নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে একটি গণতান্ত্রিক, সমতাভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়। অন্যদিকে সংবিধানে সব মানুষের সমঅধিকারের কথা বলা হলেও গত কয়েক দশক ধরে সাম্প্রদায়িক হামলা ও বিভিন্ন ধরনের সাম্প্রদায়িক অপতৎপরতার ঘটনা আমাদের সমাজে ঘটেই চলেছে, যা মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ম্লান করে দিচ্ছে।’

গত কয়েক দিনে দেশে সাম্প্রদায়িক ইস্যু নিয়ে সংঘটিত বেশ কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করে রেখা চৌধুরী বলেন, ‘এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন মনে হলেও প্রতিটি ঘটনা সাম্প্রদায়িকতার সুতোয় বাঁধা। একশ্রেণির উগ্রমৌলবাদী গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে এবং অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে একের পর এক এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে দেশে সাম্প্রদায়িক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে আসছে। এ ধরনের ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীদের স্বরূপ সবার সামনে উন্মোচন করা হচ্ছে না। তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা হচ্ছে না; বরং নাগরিক সমাজ, মানবাধিকারকর্মী এবং ভিন্ন মতবাদের মানুষ ও মুক্তচিন্তার মানুষের জন্য যে ধরনের পরিসর থাকা প্রয়োজন, তা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার, উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে প্রশ্রয় দেওয়ার ফলে নারীর প্রগতি, সমঅধিকার, নারীর প্রতি সহিংস আচরণ বন্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে আরও জটিল হয়ে উঠছে; যা নারীর মানবাধিকার পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তুলছে। তিনি এ রূপ বিরূপ পরিস্থিতির উত্তরণে সংগঠনের পক্ষে কয়েকটি দাবি তুলে ধরেন।

দাবিগুলো হলো:

১. যেকোনও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও উসকানিমূলক ঘটনায় প্রকৃত অপরাধী ও ইন্ধনদাতাদের নিরপেক্ষভাবে খুঁজে বের করে গ্রেফতার ও যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ সাপেক্ষে উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে।

২. সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতার আওতায় আনতে হবে।

৩. সব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে।

৪. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটানো হচ্ছে, সে বিষয়ে যথাযথ তদন্ত করে অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। 

৫. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধ করে সঠিক ও যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে।

৬. রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।

৭. ধর্মীয় সমাবেশ বা ওয়াজ মাহফিল থেকে ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ এবং নারীর বিরুদ্ধে সব ধরনের অপপ্রচার বন্ধ করতে হবে। একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ ধরনের অপপ্রচার বন্ধ করতে হবে।

৮. ৭২’ এর সংবিধানের অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক চেতনার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।

৯. মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়তে হলে আজকে সরকারি দলসহ সব রাজনৈতিক দলকে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।

১০. সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে সমন্বয় রেখে মাদ্রাসা শিক্ষার কারিকুলাম যুগোপযোগী করতে হবে এবং মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একটি  নীতিমালা তৈরি করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর কমিটির নেতারা উপস্থিত ছিলেন।