বদলে গেছে টাউন হল-কমিউনিটি সেন্টারের চরিত্র

যেখানে স্থানীয়দের শারীরিক কসরত বা খেলাধুলায় মেতে থাকার কথা ছিল, কথা ছিল— শিক্ষার্থী কিংবা  পড়ুয়ারা অবসরে বই পড়ে নিজেদের সমৃদ্ধ করার সুযোগ পাবেন; এখন সেখানে এসবের কিছুই নেই। কথা ছিল— সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে টাউন হল কিংবা কমিউনিটি সেন্টারগুলো। টাউন হলের উন্মুক্ত পরিসর থেকে কিশোর-কিশোরীদের উৎসারিত আনন্দ ধ্বনি কিংবা কমিউনিটি সেন্টারের হলরুম থেকে নাটকের সংলাপ কিংবা সংগীতের সুমধুর সুরের পরিবর্তে এখন শুধু ভেসে আসে বিরিয়ানির গন্ধ!

পরিবর্তিত সমাজ কাঠামোয় বাণিজ্যিকরণের মহোৎসবের মধ্যে এসব ঐতিহ্য হারিয়েছে টাউন হল। আর টাউন হল রুপান্তরিত হয়ে নতুন করে তৈরি হওয়া কমিউনিটি সেন্টারগুলোরও চরিত্র বদলে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘টাউন হলের রূপান্তরিত কাঠামো কমিউনিটি সেন্টারও এখন চরিত্র হারিয়ে হয়ে উঠেছে বিয়ে, রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান আয়োজনের কেন্দ্র। সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ছাপিয়ে এখন সেখানে প্রায় প্রতিদিনই বিরিয়ানির গন্ধ ভাসে সেখানে।’

জানা গেছে, ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশের বৃহত্তর ১৬টি জেলায় তৈরি টাউন হল। ব্রিটিশ কর্মকর্তারা যখন কোনও শহরে যেতো, সেখানে থাকতো। বছরের নির্দিষ্ট সময় শহরের গণমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে তারা কথা বলতো। বছরের অন্যান্য সময়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড হতো। শহরের মানুষরা সেখানে নাটকসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড করতো। দেশ স্বাধীনের পর টাউন হলগুলোকে স্থানীয় লোকজনের সামজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হয়ে ওঠার কথা থাকলেও তা হয়নি। বরং এগুলো হয়ে উঠেছে একেকটি ব্যবসা কেন্দ্র।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হল প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা গেছে, ব্রিটিশ শাসনামলে তৈরি মূল টাউন হলটি বর্তমানে পরিত্যক্ত। তবে এর নিচতলায় দোকানপাটে ঠাসা। আর পরিত্যক্ত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটির ছাদে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা ঐক্য পরিষদের অফিস, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিচালিত আউটরিচ স্কুল, মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের অফিস, ৩১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের অফিস। টাউন হলের উত্তর-পশ্চিম দিকে ৩১ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনারের কার্যালয় রয়েছে। টাউন হলের পাশে মসজিদের পশ্চিমে উন্মুক্ত পরিসর সাংস্কৃতি কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করার উপযুক্ত নয়। শীতকালে ওয়াজ মাহফিলও হয় বছরে একবার। তবে মাঠটি এবার সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে। 

রাজধানীর সেগুন বাগিচা কমিউনিটি সেন্টারে গিয়ে দেখা গেছে, নিচতলা ও দোতলায় মার্কেট করা হয়েছে। কমিউনিটি সেন্টারের পরিবর্তে একাধিক জায়গায় কাঁচাবাজার লেখা রয়েছে বড় করে। কমিউনিটি সেন্টারটির হলরুম এখন পরিত্যক্ত। ভবনটি দেখে বোঝার উপায় নেই এটি কমিউনিটি সেন্টার। স্থানীয়দের কাছেও এই কমিউনিটি সেন্টার ওয়ার্ড কমিশনারের কার্যালয় ও সেগুন বাগিচা কাঁচাবাজার হিসেবে পরিচিত। 

টাউন হল

নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, এক সময় টাউন হলে সামাজিক সাংস্কৃতি কর্মকাণ্ড হতো। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমিউনিটি সেন্টার হয়েছে। লাইব্রেরি, জিমনেশিয়ামও টাউন হলের অংশ ছিল। ব্রিটিশদের ক্ষমতার শেষ দিকে টাউন হলে সময় সময় বিপ্লবী আন্দোলন হতো। দেশের বৃহত্তর ১৬ জেলায় একটি করে টাউন হল ছিল। স্বাধীনতার পর ৬৪ জেলা হয়েছে। পরে ৬৪টি টাউন হল হওয়া উচিত ছিল। আগে সবকিছু জেলা প্রশাসক ও মিউনিসিপ্যালিটির সুবিধা দেওয়া হতো। টাউন হলের সঙ্গে অনেকগুলো ঘর থাকে; একটি অডিটরিয়াম, উন্মুক্ত এলাকায় এখন মিটিং হয়। আগে গরিবরা বাইরে সভা সমাবেশ করতো, বড়লোকরা বাইরে মিটিং করলে সম্মান থাকবে না, তাই মিটিংগুলো হলের মধ্যে হতো। 

কমিউনিটি সেন্টার মানেই জিম, খেলাধুলার ব্যবস্থা থাকার কথা; মেয়েদের সেলাই শেখার মতো বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকার কথা বলে উল্লেখ করে স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন। তিনি বলেন, অথচ এগুলোতে এখন দিনরাত শুধু বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। যে উদ্দেশে কমিউনিটি সেন্টার করা হয়েছিল। সেটা হয় না। রাজনৈতিকভাবেও দখল হয় কমিউনিটি সেন্টার। আগে টাউন হলে যা ছিল এখন দুই সিটি করপোশেনের প্রধান অফিসে তা রয়েছে। সিটি করপোরেশন মিটিং করার জন্য টাউন হলে যান না। এলাকাভিত্তিক কমিউনিটি সেন্টার সিটি করপোরেশনের অধীনে করা হয়েছে, জেলাগুলোতেও করা হয়েছে। সেখানে হওয়ার কথা অনেক কিছু। নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হওয়ার কথা। নারীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, ভলান্টিয়ার সার্ভিস দেওয়ার কথা ছিল। এলাকার ভলেন্টিয়াররা এর সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা ছিল। এখন লিজ দেওয়া হয়। দিনরাত বিয়ে ও রাজনৈতিক মিটিং হচ্ছে। এলাকার যুবকরা কিছুই করতে পারছে না। নাকে রুমাল দিয়ে ঢুকতে হয় কমিউনিটি সেন্টারে। শুধু বিরিয়ানির গন্ধ ভাসে।’
 
প্রায় একইরকম কথা বললেন আরেক নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব। তার কথায়, ‘টাউন হল ছিল সিটি সেন্টার। টাউন হল ব্রিটিশদের কনসেপ্ট। যেখানে শহরের সকল মানুষ সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে মিলিত হতো। আমাদের টাউন হলের কনসেপ্টা ধীরে ধীরে কমিউনিটি সেন্টারে পরিবর্তিত হয়েছে। এখন কমিউনিটি সেন্টারকে বলছে সার্ভিস সেন্টার। টাউন হলকে এখন বলা হচ্ছে সিটিজেন সার্ভিস সেন্টার। স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে শহরের জনগণের সব কর্মকাণ্ড সেখানে চলবে।‘

3

শহরে মানুষ বেড়েছে, এখন মহানগরগুলোতে নগরভবন করা হয়েছে বলে জানান স্থপতি ইকবাল হাবিব। তিনি বলেন, সবগুলোই বিভিন্ন ফর্মে পরিবর্তিত হয়েছে। আসলে এর উদ্দেশ্য ছিল— মানুষ বেড়ে গেলে সেই হারে কর্মকাণ্ডও বাড়া উচিত। কিন্তু তা না হওয়ায় প্রশাসনিক ও সামাজিক সংস্কৃতিও পরিবর্তিত হয়ে গেলো। আলাদা হয়ে নগরভবন ছোট ছোট কমিউনিটি সেন্টার হলো। আর সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো আলাদা হয়ে গেলো। দিনশেষে সবগুলো কমিউনিটির পাবলিক স্পেস বা এলাকাভিত্তিক গণপরিসর আচ্ছাদিত হয়ে গেলো ঘর হিসেবে। সুবিধাটা আমরা হারিয়েছি। এখন আর সমাজভিত্তিক, পাড়া বা মহল্লাভিক্তি কর্মকাণ্ড আর করি না। আর সে কারণে টাউন হল কনসেপ্টটাই হারিয়ে গেছে।‘

তবে এ অবস্থার পরিবর্তন করার সুপারিশ তুলে ধরেন এই স্থপতি। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, একটি শহরকে বাঁচানোর সবচেয়ে বড় উপাদান হচ্ছে পাড়া-মহল্লায় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক হাব তৈরি করা। ওয়ার্ডভিত্তিক নিজস্ব একটি গণপরিসর তৈরি করা উচিত। যেখানে মানুষ, যেকোনও অনুষ্ঠান, প্রতিবাদ, আন্দন, সাংস্কুতিক কর্মকাণ্ড বাণিজ্যিক নয় শুধুমাত্র সেবার মূলে করতে পারবে। এটা যদি না হয় সামাজিক কর্মকাণ্ডগুলো না করতে পারি, তাহলে কমিউনিটিতে কমিউনিটি সেন্টারের নামে নুইসেন্স তৈরি করা হবে। এই ধরনের কর্মকাণ্ড আমাদের পরিবেশ নষ্ট করছে। এখনও সময় আছে ওয়ার্ডভিত্তিক সামজিক সেবা কেন্দ্র তৈরির করার বিষয়ে নতুনভাবে ভেবে দেখা উচিত। সামজিক আন্দোলন করার কেন্দ্রস্থল করা যতে পারে। পারস্পারিক সম্পর্কহীনতার কারণ এখন সামাজিক কর্মকাণ্ডগুলো করতে না পারা। নতুন করে ভালো কিছু করা যায়।  শিক্ষার্থীরা সামাজিক কর্মকাণ্ড করবে। নাটক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড করা না গেলে আমরা আরও সমাজ নষ্ট করবে। সিটি করপোরেশনের উচিত বিষয়টি নিয়ে ভালোভাবে কাজ করা। ’

মোহাম্মদপুর টাউন হলের বিষয়ে ৩১ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম সেন্টুর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে পাওয়া যায়নি। তবে ওয়ার্ড কমিশনারের অফিস থেকে জানানো হয়, পুরাতন টাউন হলটি ঝুঁকিপূর্ণ। নতুন করে টাউন হলটি করার জন্য সিটি করপোরেশনকে বার বার জানানো হয়েছে। সিটি করপোরেশন উদ্যোগ নিলে এলাকাবাসীর বিভিন্ন সুবিধা হবে। নাগরিক বিভিন্ন সুবিধা ছাড়াও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, নাটক, গানসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডও বেগবান হবে। মাঠটি সংস্করের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংস্কার হয়ে গেলে খেলাধুলাসহ এলাকাবাসী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে। ‘

টাউন হল কাঁচাবাজার দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. লূৎফর রহমান বাবুল বলেন, ‘কাঁচাবাজারের অংশ আমরা মেরামত করি। আবার সংস্কার হবে। ঝুঁকিপূর্ণ অংশ হচ্ছে পাকা মার্কেটটি।’

জনসাধারণের সেবামূলক কাজে টাউন হলের উন্নয়ন বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভেঙে সুন্দর করে করলে তো ভালই হয়। আমরা সবাই চাই টাউন হলের উন্নয়ন হোক।’  

সেগুন বাগিচা কমিউনিটি সেন্টারের বিষয়ে ২০ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার ফরিদ উদ্দিন আহম্মদ রতন বলেন, ‘হল পরিত্যাক্ত- কথাটি ঠিক নয়, এখন মেরামত করা হচ্ছে। মেরামত করা হলে ব্যবহার করা যাবে। ভার্টিক্যালি এক্সটেনশন করে আরও ৫ তলা বৃদ্ধি করা হবে। তখন জিম, লাইব্রেরি এসবও থাকবে। ’  

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সমাজকল্যাণ শাখার অধীনে বর্তমান মোট ১৩টি কমিউনিটি সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি সেন্টার মেরামত ও সরকারি কাজে ব্যবহার হওয়ায় বর্তমানে আটটি কমিউনিটি সেন্টার থেকে নাগরিকদের সেবা পাওয়ার কিছু সুযোগ রয়েছে। সামাজিক অনুষ্ঠানের মধ্যে পুনর্মিলনী, বিয়ে, বার্ষিকী, করপোরেট মিটিংসহ যেকোনও সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত ভাড়ার বিনিময়ে এই কমিউনিটি সেন্টারগুলো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্র মোট ৩৬টি।