চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বেসরকারি বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন দগ্ধরা। ঘটনার পর স্বজনদের কাছে দেওয়া তাদের বিবরণে সবার নিশানায় ছিল কেমিক্যাল বিস্ফোরণের বিষয়টি। আহতরা বলছেন, এমন বিপর্যয়ের জন্য আগুনের চেয়েও বেশি দায়ী তরল দাহ্য কেমিক্যাল।
ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন পাঁচজন রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য মিলেছে। সোমবার (৬ জুন) ও মঙ্গলবার (৭ জুন) তারা হাসপাতালটির করিডোরে বসে বাংলা ট্রিবিউনকে শুনিয়েছেন সেই ভয়াবহ ঘটনার কথা। তাদের চোখে-মুখে দগ্ধ স্বজনদের নিয়ে ভয়াল ছাপ লক্ষ্য করা যায়।
সীতাকুণ্ডের ঘটনায় পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের এসআই কামরুল হাসান চিকিৎসাধীন রয়েছেন বার্ন ইনস্টিটিউটে। তার ভাই নেয়ামত উল্লাহ জিসান জানান, কামরুলের বর্ণনা অনুয়ায়ী দুর্ঘটনার খবর পেয়ে টিম নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরাও সেখানে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ করছিলেন। এর কিছুক্ষণ পর বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটলে বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এসআই কামরুলের বরাতে জিসান জানান, আগুন নেভানোর কাজে নিয়োজিত ফায়ার সার্ভিসের বেশ কয়েকজন কর্মী সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়েন। এর কিছুটা দূরে উৎসুক জনতাকে সরানোর কাজে ব্যস্ত থাকা পুলিশ সদস্যরা একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হন, বাদ যাননি শ্রমিক ও জনতাও। বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে কেমিক্যাল মাখা কিছু একটা এসে কামরুলের পায়ে আঘাত করলে মুহূর্তেই শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে এক কনেস্টবল এসে তাকে উদ্ধার করে নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে যান। হাসপাতালে পাঠানো হয় কামরুলকে।
সজিব নামে আহত একজন গাড়িচালকের ভাই সবুজ বলেন, ডিপোতে আগুন লাগলে ৩০০ ফিট দূরে থেকে ভিডিও কল করে সেই দৃশ্য দেখাচ্ছিলেন ভাই। এমন সময় বিস্ফোরণ ঘটলে কেমিক্যাল পদার্থ উল্কা-বৃষ্টির মতো চারদিকে ছিটে পড়তে দেখা যায়। বিস্ফোরণের বাতাসে অনেক দূরে ছিটকে পড়েন সজিব, শরীরের ৭ শতাংশ কেমিক্যাল ও আগুনে দগ্ধ হয়। ডিপোর পকেট গেট দিয়ে তাকে বের করে অন্যরা হাসপাতালে পাঠান।
ওই ঘটনায় দগ্ধ আরেকজন শারমিন গ্রুপের কাভারভ্যান চালক নজরুল ইসলাম মণ্ডল বর্তমানে বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন। তার ভাই বলেন, কনটেইনারে আগুনের খবর শুনে গাড়ি থেকে নেমে দেখতে গিয়েছিলেন নজরুল। এ সময় হঠাৎ বিস্ফোরণ হলে আগুনযুক্ত কেমিক্যাল এসে পড়ে তার গায়ে। তখন বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার করছিলেন তিনি। পরে অন্যদের সঙ্গে তাকেও উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ছেলের সহকর্মীদের বরাতে গুরুতর দগ্ধ ফায়ার সার্ভিসকর্মী গাউসুল আজমের বাবা আজগর আলী বলেন, এমন ভয়াবহ ঘটনা তারা আগে কখনও দেখেননি। বিস্ফোরণের সময় কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ যায়। তরল কেমিক্যালের কারণে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
আরেক ফায়ার সার্ভিসকর্মী রবিনের স্ত্রী বন্যা আক্তার বলেন, ‘একটি অপরিচিত মোবাইল নম্বর থেকে কল করে স্বামীর অগ্নিদগ্ধ হওয়ার খবর জানানো হয়। বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তির কথা জানতে পেরে ছুটে এসেছি। মানুষের জীবন বাঁচাতে গিয়ে তিনি এখন হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন, সবাই তাদের জন্য দোয়া করবেন।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বেসরকারি বিএম কন্টেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণ ও আগুনে ৬৩ জনের চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছয় জনের চোখের সমস্যা গুরুতর। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বার্ন ইনস্টিটিউটের এক সূত্র জানিয়েছে, তাদের এখানে চিকিৎসাধীন রোগীদের প্রায় সবার চোখে সমস্যা দেখা যাচ্ছে। লাল হয়ে আছে চোখ, আলোতে তাকাতে পারছেন না তারা। এর পেছনেও কেমিক্যালের প্রভাব রয়েছে।
এদিকে, বার্ন ইনস্টিটিটউটে ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে অবস্থান করা বিএম কনটেইনার ডিপোর স্মার্ট গ্রুপের জিএম (কমার্শিয়াল) মমতাজ উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা রোগীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার জন্য এখানে সার্বক্ষণিক রয়েছি। তবে আগুন ও বিস্ফোরণের ঘটনায় তাদের প্রতিষ্ঠান দায়ী নয়। কেমিক্যালের বিষয়ে জানতে চাইলে কথা বলতে অপারগতা জানান তিনি।
সীতাকুণ্ডে বেসরকারি বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নি দুর্ঘটনায় দগ্ধ হয়ে মোট ১৯ জন রোগী ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে এসেছিলেন। এর মধ্যে এখনও চিকিৎসাধীন ১৬ জন। ভর্তি রোগীদের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছেন তিনজন। এছাড়া চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে ৮৭ জন দগ্ধ রোগীর চিকিৎসা চলছে। সব মিলিয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ১০৬ জন।