মায়ের লাশ উদ্ধারের পর বাবা কারাগারে, দুই শিশুর কী হবে?

দেড় বছর বয়সী যমজ ভাইবোন ফাতেমা ও রহমান। গত ১৮ মে তাদের মা স্বর্ণা আক্তারের (২৪) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। তাদের নানা আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেন। পুলিশ দুই শিশুর বাবা রনি হাসানকে গ্রেফতার করে। দুই শিশুর মুখে এখনও ভালো করে কথা ফোটেনি। তবে তাদের জীবনের ওপর দিয়ে এভাবেই ঝড় ভয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে দাদির কাছে থাকলেও এত ছোট বয়সে বাবা মা ছাড়া বেড়ে ওঠাই এখন তাদের সবচেয়ে কঠিন পথ। 

কামরাঙ্গীরচরের কামরুল ইসলাম কমিউনিটি সেন্টারের পাশের একটি বাড়িতে দাদির কাছে বেড়ে ওঠছে ফাতেমা ও রহমান। এই বাসাতে তাদের এক ফুফু, চাচা রবিন হাসান ও তার স্ত্রী বসবাস করেন। জরাজীর্ণ বাসার নীচে নারীদের পোশাক তৈরির কারখানা।  ভবনটির দোতালায় তারা থাকেন।

গত ১৯ জুন দুপুরে ওই বাড়িটিতে গিয়ে দেখা যায়, ভবনটির নিচতলার কারখানায় শ্রমিকরা কাজ করছে। এক কিশোর এই প্রতিবেদককে সিঁড়ি বেয়ে দুই শিশুর কাছে নিয়ে যাচ্ছিল। সিঁড়িতে ওঠার সময় কারখানার এক কর্মচারী নিচে নেমে আসতে বলেন। তিনি বলেন, ‘বাসায় পুরুষরা কেউ নেই। নিচে আসুন।’ এরপর এই প্রতিবেদককে কারখানার একটি অফিস কক্ষে বসানো হয়। কিছুক্ষণ পর সেখানে দুই শিশুর চাচা রবিন হাসান আসেন।

ঘটনার দিনের বর্ণনার শুরুতেই তিনি বলেন, গত ১৮ মে সকালে নাস্তা তৈরি করেন স্বর্ণা ভাবি। নাস্তা নিজেই আমাদের পরিবেশন করেন। এরপর রনি মোহাম্মদপুরের টোকিও স্কয়ারের দোকানে চলে যায়। আমিও কাজে বের হই। সকাল ৯টার দিকে বাসা থেকে আমার স্ত্রী আমাকে জানায়, স্বর্ণা ভাবী দরজা বন্ধ করে ভেতরে রয়েছে। কোনও সাড়া নেই। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আমি চলে আসি। দরজা ভেঙে ভাবিকে তার কক্ষে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পাই। রনিও দ্রুত বাসায় আসে। ‘৯৯৯’ এ কল করলে পুলিশ আসে। তারা লাশ নামিয়ে নিয়ে যায়।

স্বর্ণা ও রনির বাড়ি মুন্সিগঞ্জে একই এলাকার। তবে রনির বাবা নুরুল ইসলাম সত্তরের দশকে ঢাকায় চলে আসেন। কামরাঙ্গীরচরে তারা ব্যবসা শুরু করেন। নিজেদের বাড়ি করেন। ২০১৭ সালে রনির সঙ্গে স্বর্ণার বিয়ে হয়। তারা দুজন দুজনকে পছন্দ করতেন। ২০২১ সালে তারা যমজ সন্তানের বাবা মা হন।

ঘটনার দিন কাকতালীয়ভাবে মেয়ের জন্য আম ও দুধ নিয়ে কামরাঙ্গীরচরে আসছিলেন স্বর্ণার বাবা শাহজাহান ঢালী। পথে কেরানীগঞ্জে বসে তিনি শুনতে পান মেয়ের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ওই দিনই সকল আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সন্ধ্যার দিকে মেয়ের লাশ নিয়ে মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে বাড়ি যান শাহজাহান ঢালী। সেখানেই মেয়ের দাফন সম্পন্ন করেন।

গত ১৯ মে এই ঘটনায় তিনি আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ এনে কামরাঙ্গীরচর থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় আসামি করা হয় স্বর্ণার স্বামী রনি হাসানকে। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। বর্তমানে কারাগারে রনি। 

মামলায় শাহজাহান ঢালী অভিযোগ করেছেন, ‘রনি আমার মেয়েকে কথায় কথায় অপমান করতো। মেয়ে অপমান সহ্য না করতে পেরে আত্মহত্যা করেছে।’

স্বর্ণাকে শ্বশুরবাড়ির লোকজন বিভিন্নভাবে নির্যাতন করতো উল্লেখ করে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মেয়ের লাশ উদ্ধার হওয়ার কয়েক মাস আগে একদিন আমরা পুত্রা (মেয়ের দেবর) রবিন ফোন দিয়ে আমাকে বলে, ‘আপনার মেয়ে নিয়ে যান, আপনার মেয়ে আমাদের কথা শোনে না। সে একজনের কথা আরেকজনকে বলে।’ তাদের ফোন পেয়ে গভীর রাতে আমি ঢাকা যাই। আমি আমার মেয়েকে নিয়ে আসতে চাই। কিন্তু তারা সেদিন দেয়নি।

তিনি বলেন, রবিন ও রনির বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কথা জানতো স্বর্ণা। এ নিয়ে ঝামেলা ছিল। আমার মেয়ের পা যেভাবে খাটের বিছানার সঙ্গে লেগেছিল, তা কেউ বলবে না সে আত্মহত্যা করছে। তাকে মারা হয়েছে।

শাহজাহান ঢালীর অভিযোগের বিষয়ে রবিন হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, স্বর্ণা ভাবির বাবা যেসব কথা বলছেন, তা সঠিক না। ঘটনার আগের দিন রাতে ভাই ও ভাবির ঝগড়া হয়েছে। তবে সকালে ভাবি নিজেই নাস্তা তৈরি করে আমাদের খাইয়েছেন। সেই মানুষ যে আত্মহত্যা করবে, তা আমরা বুঝতে পারিনি। স্বামী স্ত্রী প্রায়ই টুকটাক ঝগড়া হয়।  বছরখানেক আগেও আত্মহত্যার হুমকি দিয়েছিলেন স্বর্ণা।

স্বর্ণার মৃত্যুর পর তার দুই যমজ সন্তান দাদির কাছে বেড়ে উঠছে। মায়ের মৃত্যুর পর বাবা কারাগারে থাকায় শিশু দুটি অসহায় হয়ে পড়েছেন। কেবল কথা বলতে শেখা দুই শিশু ‘বাবা বাবা’ করে। কখনও  মাকে যাকে।

কামরাঙ্গীরচর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা একটি আত্মহত্যা প্ররোচনার অপরাধে একটি মামলা নিয়েছি। এখনও ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসেনি। রিপোর্ট আসলে জানা যাবে কিভাবে তার মৃত্যু হয়েছে।