দরজা খোলা রেখেছিলেন গৃহকর্তার ভাই, চুরির অভিযোগে নির্যাতন ‍গৃহকর্মীকে

রাজধানীর আফতাবনগরের একটি বাসা থেকে ছয় ভরি স্বর্ণালংকার চুরি হয়েছে। এর সঙ্গে সম্পৃক্ত সন্দেহে গৃহকর্মীকে মারধর করে পুলিশে দিয়েছেন গৃহকর্ত্রী ও তার পরিবার। পুলিশের রিমান্ড শেষে অন্তত ২৫ দিন কারাভোগ করেছেন ওই গৃহকর্মী। বাসায় আটকে ‘মারধর’ ও ‘ক্রসফায়ারের হুমকি’ দিয়েও কোনও তথ্য পায়নি ওই পরিবার। পরে রিমান্ডে নিয়ে পুলিশও তার কাছ থেকে স্বর্ণালংকার উদ্ধার করতে পারেনি। অথচ ওই গৃহকর্মী বাসায় যাওয়ার আগে গৃহকর্তার বড় ভাই সেখানে অবস্থান করছিলেন, তিনি তার এক বান্ধবীকে নিয়ে দরজা খোলা রেখেই বাসা থেকে উধাও হয়ে গেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

৩২ বছর বয়সী ওই গৃহকর্মী একবছর ধরে আফতাবনগরের সেক্টর ১ এর ব্লক-‘জ’ এর একটি বাসার তৃতীয় তলায় তাইফুর রহমান নামে এক ব্যক্তির বাসায় কাজ করেন। ওই বাড়ির গৃহকর্ত্রী নাজমুন নাহার তাকে মাসিক ১ হাজার ৮০০ টাকায় কাজে নেন। এক বছর ধরে তিনি ওই বাসায় কাজ করছেন।

ওই গৃহকর্মী বৃহস্পতিবার (২৮ জুলাই) বিকালে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত ১৯ জুন সন্ধ্যা ৬টার দিকে আমি ওই বাসায় কাজে যাই। বাসার দরজার সামনে গিয়ে আমি কলিং বেল দেই, কেউ দরজা খোলেনি। এরপর আমি নাজমুন নাহার আপাকে ফোনে মিস কল দেই। কিন্তু তিনি ফোন ব্যাক করেননি। আমি অন্য বাসায় কাজে চলে যাই। এর ঘণ্টাখানেক পর নাজমুন নাহার আমাকে ফোন দেন। ফোন দিয়ে তিনি জানতে চান, আমি কোথায় আছি। আমি তাকে পাল্টা প্রশ্ন করি, আপনি কই? তিনি বললেন— আমি বাইরে আছি। তুমি আমার বাসায় যাও। কাজ করো। বাসায় আমার ভাই আছে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘আমি এরপর ওই বাসায় যাই। গিয়ে দরজা ধাক্কা দিলে দরজা খুলে যায়। বাসার ভেতরে কেউ নেই। ডাইনিংয়ে লাইট জ্বলছে, ভেতরের একটি বেড রুমে ফ্যান চলছে। এরপর আমি ঘর ঝাড়ু দেওয়া শুরু করি। এরমধ্যে গৃহকর্ত্রী নাজমুন নাহার আমাকে আবার ফোন দেয়। আমাকে জিজ্ঞাসা করে— তুমি কী করো? আমি বললাম, কাজ করছি, আমার কাজতো প্রায় শেষ, ঘরেতো কেউ নেই। দরজাও খোলা। উনি এরপর আমাকে আবার বলেন— ফ্রিজ থেকে আলু-করলা বের করে কেটে রাখো। এরপর আমাকে দরজা টেনে রেখে চলে যেতে বলেন। আমি চলে যাই।’

এরপর ২০ জুন থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত প্রতিদিনই ওই বাসায় কাজ করেন ওই গৃহকর্মী। এসময় কিছুই বলেননি গৃহকর্ত্রী নাজমুন নাহার। ২৪ জুন বিকালে উপরের ফ্ল্যাটের একটি বাসায় কাজ করার সময় ফোন করে নাজমুন নাহার বাসায় ডেকে নেন। তার বাসার গয়না চুরি হয়েছে বলে তাকে জেরা করে। তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না।’ এরপর তাকে বাসায় আটকে মারধর করে নাজমুন নাহার ও তার পরিবারের সদস্যরা। এতে তিনি আহত হন।

ওই নারী বলেন, ‘তিন জন পুরুষ এবং একজন নারী আমাকে হাতুড়ি দিয়ে মারধর করে। আমার হাতে সুঁচ ঢোকানোর চেষ্টা করেছিল, তখন আমি তাদের বলি, আপনারা কি আইনের লোক? আমাকে তারা বলে— আমরা ডিবির লোক, তোকে ক্রসফায়ারে দিবো, স্বর্ণ বিক্রি করে থাকলে বল। কিন্তু আমিতো নেইনি, কীভাবে স্বর্ণ বিক্রি করবো। বাসায় মারধর করার পর আমাকে বাড়ির অফিস রুমে নিয়ে তালা দিয়ে আটকে রাখে। রাত ১২টার দিকে বাড্ডা থানার পুলিশ ডেকে আমাকে তাদের হাতে তুলে দেয়।’

এ বিষয়ে ওই বাড়ির দুই প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। তারা বলেন, বাসার গৃহকর্তার বড়ভাই একজন প্রবাসী। তিনি তার বান্ধবী নিয়ে ওই বাসায় ছিলেন সেদিন। তিনি দরজা খোলা রেখে দরজা টেনে রেখে বান্ধবী নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যান। এরপর তিনি ওই বাসায় কাজে যান।

এই ঘটনার পর বাড়ির সিসি ক্যামেরা দেখেছে পুলিশ ও বাড়ির বিভিন্ন ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা। তাতে দেখা গেছে, ১৯ জুন খালি হাতেই বাসা থেকে বের হয়ে যান ওই গৃহকর্মী।

গৃহকর্ত্রী নাজমুন নাহার তার মামলার এজাহারে অভিযোগে করেন, ‘গত ২৪ জুন বাইরে যাওয়ার জন্য আমি আলমিরা খুলে অলংকার পরতে গেলে দেখি আমার কোনও গয়না আলমিরাতে নেই। আমার বিশ্বাস, ১৯ জুন আমাদের বাসায় কেউ না থাকায় সেদিন আসামি গয়না চুরি করেছে।’

তবে বাসার দরজাটি খোলা ছিল- এ বিষয়ে মামলার এজাহারে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। গৃহকর্তার বড়ভাই যে ওই বাসায় বান্ধবীকে নিয়ে ছিলেন এবং দরজা খোলা রেখে বেরিয়ে গেছেন- সে বিষয়েও কোনও তথ্য উল্লেখ নেই। 

এ বিষয়ে নাজমুন নাহারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'আমার বাসায় চুরি হয়েছে, আমি মামলা করেছি। কিন্তু এ বিষয়ে আমি কোনও তথ্য শেয়ার করতে চাচ্ছি না।'

বাড্ডা থানায় মামলার পর তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) নাদিম মাহমুদ তার তিন দিনের রিমান্ড চান। আদালত ২৬ জুন একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। থানাতেও তার চুরির স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা চলে বলে অভিযোগ করেছেন ওই গৃহকর্মী। তবে পুলিশ তার কাছ থেকে কোনও স্বীকারোক্তি আদায় করতে পারিনি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাড্ডা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নাদিম মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা তদন্ত করছি, এখনও কোনও আপডেট নেই। বাসার দরজাটি কেন খোলা ছিল, তাও আমরা জানি না। তদন্ত চলছে, তদন্তের পর বিষয়টি জানা যাবে।’

ঘটনার দিন মারধরের পর সেই গৃহকর্মী অসুস্থ হয়ে যান। তাকে খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটতে দেখা যায়। এ সংক্রান্ত একটি ফুটেজ বাংলা ট্রিবিউনের কাছে রয়েছে। তাকে এইম’স হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।