কড়াইল বস্তিতে আধিপত্য বিস্তার: ১০ বছরে ৫ হত্যাকাণ্ড

কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ হয় রাজধানীর কড়াইল বস্তি থেকে। আর বস্তিটিতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একের পর এক সহিংসতা এবং হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে। গত ১০ বছরে কড়াইল বস্তি নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্বে প্রাণ গেছে ৫ জনের। সর্বশেষ গত ১৭ আগস্ট কড়াইলে আলামিন নামে এক যুবক হত্যাকাণ্ডের পেছনে আধিপত্য এবং চাঁদাবাজির কারণকেই দায়ী করছেন গোয়েন্দারা। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ৫ জনকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদের এসব তথ্য পায় গোয়েন্দা পুলিশ।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বনানী থানা এলাকার ১৯ ও ২০ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে কড়াইল বস্তি গড়ে উঠেছে। যার ৯০ ভাগই পড়েছে ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে। বস্তিটি গড়ে উঠেছে মূলত টিঅ্যান্ডটি, রাজউক ও পিডব্লিউডির সরকারি জায়গায়। কড়াইল বস্তিতে আনুমানিক সাড়ে ৩ লাখ মানুষের বসবাস। তারা সবাই নিম্ন আয়ের মানুষ। কড়াইল বস্তির নিয়ন্ত্রণ আধিপত্য ও দখলের জন্য তথাকথিত স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা সবসময় তৎপর থাকে। চাঁদার টাকা ভাগবাটোয়ারায় নেতৃত্ব দেয় কড়াইল বস্তিতে সাতটি ইউনিটে ভাগ করা একশ্রেণির রাজনৈতিক ব্যক্তি।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১২ সালে কড়াইল বস্তির পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস প্রভৃতির সেবা বা সংযোগ-এর অর্থ উত্তোলনের ক্যাশিয়ার বশির হত্যাকাণ্ড, ২০১৪ সালে একই কার্যক্রমে নিয়োজিত দুলাল সরদার হত্যাকাণ্ড, ২০১৮ সালে অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে কথা বলায় তিতুমীর কলেজের মাস্টার্সের ছাত্র রাকিব হোসাইন হত্যাকাণ্ড, ২০১৮ সালে একই ইস্যুতে নিহত হয় রাশেদ কাজী নামে এক চাঁদাবাজ। সর্বশেষ ২০২২ সালে আলামিন হত্যার ঘটনা ঘটে।

সর্বশেষ ১৭ আগস্ট কড়াইল বস্তিতে আলামিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ জানতে পারে, ২২ জুলাই কড়াইল বস্তির ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের ছয়টি এবং ২০ নম্বর ওয়ার্ডের একটি ইউনিট কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়। ঢাকা মহানগর উত্তর বনানী থানাধীন ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের কড়াইল বস্তির উত্তর ১ নম্বর এবং দক্ষিণ ১ নম্বর কমিটির মধ্যে দুটি করে গ্রুপ আছে, যার একটির নেতৃত্ব দেয় মোহাম্মদ আলী ও নুর। অন্যটিতে জসিম উদ্দিন রিপন ও জুয়েল সরকার। কমিটিতে পদ পাওয়া নিয়ে এই দুই গ্রুপের মধ্যে প্রকাশ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। মোহাম্মদ আলী-নূর গ্রুপের রাজনৈতিক অভিভাবক ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আব্দুল কাদের খান ওরফে বরিশাইল্লা কাদের। রিপন জুয়েল গ্রুপের রাজনৈতিক অভিভাবক স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মফিজ উদ্দিন ওরফে কাইল্লা মফিজ। কমিটি ঘোষণা হওয়ার পর দুই গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে আলামিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

সূত্র জানায়, বিভিন্ন সময় দেখা যায় সেবা সংস্থার লোকজন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে উক্ত চাঁদাবাজ লোকজনের ছত্রছায়ায় বস্তিবাসীরা হামলা করে। তবে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার এসব অবৈধ বা চোরাই সংযোগের বিষয়টি চাপা পড়ে যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কড়াইল বস্তিতে ঘর ও দোকান রয়েছে প্রায় ৪০ হাজার। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চলছে এ ধরনের চাঁদাবাজি। টিঅ্যান্ডটি, গণপূর্ত ও ওয়াসা ইত্যাদি সরকারি সেবা সংস্থার জমিতে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে এসব স্থাপনা। এসব ঘর বা দোকানের অবৈধভাবে নির্মাণ, বরাদ্দ, এবং হস্তান্তরে বড় ধরনের চাঁদাবাজি হয়ে থাকে। বস্তির অবৈধ পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস সংযোগ যেন ওপেন সিক্রেট। প্রতিমাসে গড়ে আনুমানিক চাঁদা ওঠে ২০ কোটি টাকা। যা যায় বিভিন্ন মহলে।

ডিএমপি গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কড়াইল বস্তিতে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার জন্য বেশ কয়েকটি গ্রুপ সক্রিয়। তারা তাদের আধিপত্য জানান দেওয়া এবং ভাগবাটোয়ারা নিয়েই বিভিন্ন সময় মারামারি সংঘর্ষ হয়ে থাকে। আর সংঘর্ষের কারণেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর আগেও যেসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে সেসব বিষয়গুলোর মামলা চলমান রয়েছে। সব বিষয়ে মাথায় রেখেই বস্তি এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।