বাংলাদেশে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র (এসি) ব্যবহারের সঠিক নীতিমালা না থাকায় ও এর যথেচ্ছ ব্যবহারে ঢাকা শহর একটি ‘নগর তাপদ্বীপে’ পরিণত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শুক্রবার (২১ অক্টোবর) ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) কর্তৃক ভার্চ্যুয়ালি আয়োজিত ‘ভবনে এসি ব্যবহারজনিত বিদ্যুৎ চাহিদা ও নগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি: টেকসই ভবন ও শহর বিনির্মাণে করণীয়’ শীর্ষক সংলাপে তারা এ মতামত ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে আইপিডি’র তত্ত্বাবধানে পরিচালিত পরিকল্পনাবিদ মো. রেদওয়ানুর রহমানের ‘ভবনে এসি ব্যবহারজনিত বিদ্যুৎ চাহিদা ও নগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণার সারাংশ উপস্থাপন করেন ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান।
বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রয়োজনে এসির ব্যবহার বেড়েই চলেছে উল্লেখ করে মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ‘এর ফলে নগর তাপদ্বীপ তৈরি হচ্ছে এবং পরিবেশের প্রভূত ক্ষতি করছে। অথচ কার্যকর নগর পরিকল্পনা, ইমারত বিধিমালা এবং এসি ব্যবহারের সঠিক নীতিমালা থাকলে এই যন্ত্রের ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুতের উপর চাপও বহুলাংশে কমানো যেতো।’
শুধু ঢাকা শহরেই প্রতি বছর এসি’র ব্যবহার ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে উল্লেখ করে বলা হয়, ‘সারা দেশের ব্যবহৃত এসির বেশিরভাগই ঢাকায় ব্যবহার হচ্ছে। একইসঙ্গে নগর এলাকায় কংক্রিট তথা ধূসর কাঠামো বেড়ে যাওয়ায় বিগত কয়েক দশকে ঢাকার তাপমাত্রা বেড়েছে, তাৎপর্যপূর্ণভাবে যা পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য প্রভূত হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
এসি ব্যবহারের সময় তাপমাত্রা চার-পাঁচ ডিগ্রি বাড়িয়ে ২০-৩০ ভাগ বিদ্যুৎ চাহিদা কমানো সম্ভব উল্লেখ করে অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘অনুরূপভাবে সঠিক পরিকল্পনা ও নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে এসি’র ব্যবহার সীমিত করার মাধ্যমে সারাদেশের বিদ্যুৎ চাহিদা বহুলাংশে কমানো সম্ভব। তা না হলে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনে নির্ভরতা বাড়িয়ে দেশের বিদ্যমান বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা সম্ভব হবে না।
ভবন নির্মাতাদের চাপের কারণে ২৪ ডিগ্রি তাপমাত্রার এসি সিস্টেম স্থাপন করা যাচ্ছে না উল্লেখ করে আইপিডি’র সংলাপে বলা হয়, ‘এটা করতে পারলে ভবনের ৪০ ভাগ বিদ্যুৎ চাহিদা কমানো সম্ভব হতো। পাশাপাশি আমাদের নির্মাণ বিধিমালায় এনার্জি এফিসিয়েন্সি রেশিও (ইইআর) সংক্রান্ত নীতিমালা না থাকলে ভবনগুলো এনার্জি সাশ্রয়ী হিসেবে নির্মাণ করা যাচ্ছে না।’
সংলাপে অংশ স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, এসির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে বিদ্যুৎ সংকট প্রকটতর হচ্ছে, অথচ দেশে কৃষি কাজের জন্য বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। এসি’র নিরবিচ্ছিন্ন ব্যবহার নিশ্চিত করতে তেলনির্ভর জেনারেটর চালানো হচ্ছে, যা শব্দ ও বায়ূদূষণ করার মাধ্যমে সামগ্রিক পরিবেশ দূষণ বাড়াচ্ছে।’
এসি ব্যবহার সমাজে এক ধরনের বিদ্যুৎ বৈষম্য তৈরি করছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এসি ব্যবহারের এই অচ্ছেদ্য চক্র থেকে বের না হতে পারলে আমাদের বিদ্যুৎ সংকটের টেকসই সমাধান হবে না।’
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়র সহকারী অধ্যাপক স্থপতি শাহরিয়ার ইকবাল রাজ বলেন, ‘এসি ব্যবহার ও নগরে তাপমাত্রা কমানোর জন্য ভবনের স্থাপত্য নকশা ও ভবন তৈরির উপাদান নিয়ে স্থপতি ও নির্মাণ সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। যেসব ভবনে এসি’র চাহিদা বেশি, সেখানে কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা করা গেলে বিদ্যুৎ চাহিদা কমে। এছাড়া ভবনের ছাদে–দেয়ালে ও অভ্যন্তরে বিভিন্ন নির্মাণ কৌশল ব্যবহার করে টেকসই ভবন নির্মাণ করা সম্ভব।’
এমইপি ডিজাইন স্টুডিওর চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. মামুন ফেরদৌস বলেন, ‘এসি সংক্রান্ত নীতিমালা না থাকায় ভবন নির্মাতাদের চাপের কারণে ২৪ ডিগ্রি তাপমাত্রার এসি সিস্টেম স্থাপন করা যাচ্ছে না। অথচ এটা করতে পারলে ভবনের ৪০ ভাগ বিদ্যুৎ চাহিদা কমানো সম্ভবপর হতো। পাশাপাশি আমাদের নির্মাণ বিধিমালায় এনার্জি এফিসিয়েন্সি রেশিও (ইইআর) সংক্রান্ত নীতিমালা না থাকলে ভবনগুলো এনার্জি সাশ্রয়ী হিসেবে নির্মাণ করা যাচ্ছে না।’