তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি এখনও জনগণের কাছে বিরোধী দল হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি, এটা সত্য। আমরা আশা করব, গণতন্ত্রের স্বার্থে জাতীয় পার্টির যে ভূমিকা রাখা উচিত, তারা তা সঠিকভাবে পালন করবে। সেজন্য জাতীয় পার্টির যে স্পেস (জায়গা) প্রয়োজন, আওয়ামী লীগ তা করে দিতে প্রস্তুত।
কাজী জাফরউল্যাহ বলেন, আমরা চাই ভবিষ্যতে যাতে আর কোনও ওয়ান-ইলেভেন না ঘটে। আবার কোনও অনির্বাচিত শক্তিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় দেখতে চাই না।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, জাতীয় পার্টির ভেতরে ‘ক্রাইসিস’ দেখতে পাচ্ছি, চমক দেখালেন এরশাদ। তাদের গঠনতন্ত্রে কোথাও নেই এরশাদ সাহেব কাউকে কো-চেয়ারম্যান করতে পারেন। এগুলো তো স্বৈরাচারী আচরণ। তারা বন্দুকের সাহায্যে ক্ষমতায় এসেছেন,ওই বন্দুকের কথা আর ভুলতে পারেন না।
বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগের আসন্ন সম্মেলন, চলমান রাজনীতি, মধ্যবর্তী নির্বাচন, বিএনপির সম্মেলনসহ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক নানা বিষয়ে কথা বলেন এই নেতা।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব
জাতীয় রাজনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের চর্চা করে, গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে। আওয়ামী লীগ সব সময় চায়, একটা শক্তিশালী বিরোধী দল থাকুক। কারণ,আমরা জনগণের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছি, বন্দুকের নল ঠেকিয়ে নয়। আমাদের রাজনীতি হচ্ছে সাধারণ জনগণের পাশে থেকে তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানো। সেখানে আমাদের ভয়-ভীতির কোনও সুযোগ নেই। মানুষ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা চায়। এটি থাকলে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অর্থনীতি-আইনশৃঙ্খলা, সামজিক জীবনমান সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ হয়ে গেলে কিছুই নিয়ন্ত্রণে থাকে না।
মধ্যবর্তী নির্বাচন হবে না
মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন,এগুলোকে বলে ‘রাজনৈতিক আওয়াজ’। রাজনীতিতে তারা পেছনে পড়ে গেছে, তাদের কোনও অ্যাক্টিভিটিজ নাই, এসব কথা আর মাঝে মাঝে দু’একটা বিবৃতি দিয়ে তারা নেতাকর্মীদের সজাগ রাখতে চায়। এর বাইরে কিছু নয়। তারা জানে মধ্যবর্তী নির্বাচন হবে না।
বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বে ব্যর্থতা রয়েছে
বিএনপির কেমন নেতৃত্ব আশা করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন,তাদের নেতৃত্ব কেমন হবে সেটা তাদের ব্যাপার। গঠনতন্ত্র বিএনপিরও আছে। তারা একটি বড় দল। তারা তিনবার ক্ষমতায় ছিল। এগুলো তো ভুলে গেলে চলবে না। তারা কী চায়, সেটা তাদের ওপরই নির্ভর করছে। তবে তাদের বর্তমান নেতৃত্বে তো ব্যর্থতা রয়েছেই। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ নির্বাচন বয়কট করা।
কেন্দ্রীয় কমিটির পরিধি বড় হওয়ার সম্ভাবনা
কেন্দ্রীয় কমিটির পরিধি বাড়তে পারে ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, যেহেতু বিভাগের সংখ্যা বেড়েছে, সাংগঠনিক সম্পাদকও বাড়তে পারে। আবার নাও হতে পারে। একজন দু’টি ডিভিশনের দায়িত্বও পেতে পারেন। যেগুলো ছোট বিভাগ রয়েছে সেগুলোর দু’টির দায়িত্ব একজন পালন করতে পারেন। কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীর সংখ্যা বাড়াতে সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশ আছে বলেও জানান তিনি।
রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ চমক খোঁজে না
আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে চমক খোঁজে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি চমক দিতে পারে। তারা আজকে এক কথা, কালকে আরেক কথা বলে। কিন্তু আমরা কথা আর কাজে মানুষের আস্থা-বিশ্বাস ধরে রাখতে চাই। সারা পৃথিবী বাংলাদেশকে এখন ‘রোল মডেল’ হিসেবে দেখছে। সেটা যদি আমরা ধরে রাখতে পারি,তাহলে তা হবে বিশাল চমক।আমরা স্বচ্ছতা বাড়াতে চাই। স্বচ্ছতা বাড়লে চমক বাড়বে।
ইউপি নির্বাচনের কারণে সম্মেলন পেছাবে না
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের কারণে দলের সম্মেলন পেছানো হবে না জানিয়ে জাফরউল্যাহ বলেন,সম্মেলন হচ্ছে দলীয় বিষয়। আওয়ামী লীগের সম্মেলনে অল্পসংখ্যক কাউন্সিলর আসবেন। নির্বাচনে এর কোনো প্রভাব পড়বে না।
কী পরিবর্তন আসতে পারে এবারের সম্মেলনে-পরিবর্তনই যদি না থাকে তাহলে সম্মেলন করে লাভ কী? আমাদের উদ্দেশ্য সময় মতো সম্মেলন করা, দল মজবুত করার জন্য নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি করা। তাছাড়া, দলীয় একটি ভিশন তো আমাদের আছেই।
রেহানা-জয়ের রাজনীতিতে আসার বিষয় ‘নেত্রী’ সিদ্ধান্ত নেবেন
শেখ রেহানা বা সজীব ওয়াজেদ জয় রাজনীতিতে আসবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন,এই মুহূর্তে আমার মনে হয় না শেখ রেহানা আমাদের কমিটিতে কোথাও আসবেন। জয়ও এই মুহূর্তে দলীয় পদে আসবেন বলে মনে হয় না। তবে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন নেত্রী।
যোগ্য সাধারণ সম্পাদক প্রত্যাশা
কাজী জাফরউল্যাহ বলেন, অবশ্যই যোগ্য ব্যক্তিকেই আমরা দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দেখতে চাই। ত্যাগী নেতা,তৃণমূলে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যার সম্পর্ক আছে, যিনি দলের জন্যে সময় দিতে পারবেন,ভবিষ্যতে যেসব কার্যক্রম হবে, সব কিছুতে অংশগ্রহণ করতে পারেন,এমন একজন সাধারণ সম্পাদক আপামর জনসাধারণের প্রত্যাশা।
কেন্দ্রীয় সম্মেলনের আগেই নগর কমিটি
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম এ নেতা বলেন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের কমিটির তালিকা করা হয়েছে। সভাপতির হাতেও দেওয়া হয়েছে। পৌরসভা নির্বাচন ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ আজিজ মারা যাওয়ার কারণে কমিটি ঘোষণা দেওয়ার সময় পিছিয়ে গেছে। তবে কেন্দ্রীয় সম্মেলনের আগেই ঢাকার দুই কমিটির ঘোষণা আসবে।
সময় সুযোগ হলে আজিজের পরিবার থেকে নেতা হবে
আজিজের পরিবারের কেউ মহানগর আওয়ামী লীগের পদে আসবেন কিনা, জানতে চাইলে জাফরউল্যাহ বলেন,আওয়ামী লীগ তো আর কোনো কোম্পানি নয় যে এক ডিরেক্টর মারা গেলে তার পরিবারের ছেলে বা অন্য কেউ ডিরেক্টর হবেন! আজিজ সাহেবের ছেলেকে বিগত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমরা কাউন্সিলর হিসেবে দেখেছি। নির্বাচিত হয়েছেন। এখন তিনি দলের জন্যে কাজ করবেন। যোগ্যতা দিয়ে তিনি দলে স্থান করে নেবেন।
বিদ্রোহে মদদদাতাদের সদস্য পদ বাতিল হতে পারে
বিদ্রোহীদের ব্যাপারে আমাদের সিদ্ধান্ত হয়েছে। গত পৌর নির্বাচনে কোনও নেতা পেছন থেকে বিদ্রোহী প্রার্থীদের মদদ দিয়ে থাকলে,তাদের চিহ্নিত করার জন্যে ইতিমধেই নির্দেশ দেওয়া হয়ে গেছে। সেই রিপোর্টও আমাদের কাছে এসে গেছে। তদন্তে কেউ যদি দোষী সাব্যস্ত হন তাকে শো-কজ নোটিশ দেওয়া হবে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক সদস্য পদও চলে যাবে। প্রাথমিক সদস্য পদ চলে গেলে দলের মনোনয়ন নিয়ে যদি সে এমপি থাকে সেটাও চলে যাবে। এটা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
মাহফুজ আনামের ভুল স্বীকারকে অ্যাপ্রিশিয়েট করি
মাহফুজ আনামের মতো একজন মানুষ যখন ভুল করে সৎ সাহসের সঙ্গে সেই ভুল স্বীকার করেন, তখন আমি ব্যক্তিগতভাবে সেটাকে অ্যাপ্রিশিয়েট (উৎসাহিত) করি। আমি মাহফুজ আনামকে ধন্যবাদ জানাই, দেরিতে হলেও তিনি এটা বুঝেছেন ওয়ান ইলেভেনে যে শক্তি এসেছিলেন, তারা আমাদের জনগণের কোনও উপকারের জন্য আসেননি। তারা তাদের ক্ষমতার লোভেই এসেছিলেন। ব্যক্তিগত স্বার্থে ভুল পরামর্শে তারা ক্ষমতা ভোগ করার জন্য এসেছিলেন। তখন ডেইলি স্টারের মত অনেক পত্রিকা সেই অনির্বাচিত সরকারকে স্বাগত জানিয়েছিল। এখানে ডেইলি স্টার কিন্তু একা নয়। মাহফুজ আনাম যে তার ভুল স্বীকার করেছেন-‘দিস ইজ এ গুড স্টেপ। তিনি একজন সাহসী লোক। তিনি বুঝতে পেরেছেন একটা ভুল করেছিলেন। যার জন্য আমরা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। শেখ হাসিনাকে জেলে যেতে হয়েছে।
/পিএইচসি/এমএসএম/এপিএইচ/এজে/আপ-এআর/