রাজধানীর মডেল থানাসহ বেশকিছু থানায় ঘুরে জানা গেছে,নারীদের সঙ্গে আচরণ কেমন করতে হবে,তাদের বিষয়গুলো কিভাবে সংবেদনশীলভাবে নিরসন করতে হবে তা নিয়ে কখনোই কেউ নির্দেশনা দেননি। যদিও পুলিশ সংস্কারের সঙ্গে জড়িতরা বলছেন,একাধিকবার থানায় গাইডলাইন পাঠানো হয়েছে। কিন্তু থানার লোকজন বইটা খুলেও দেখেননি হয়তো। এটা মেনে চলতে বাধ্য করতে হলে জোরদার মনিটরিং দরকার বলে মনে করছেন ইউএনডিপির জেন্ডার কনসালট্যান্ট ফওজিয়া খন্দকার।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উন্নত প্রশিক্ষণ ও মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি করে বাংলাদেশ। ওই চুক্তি অনুযায়ী সাড়ে ১৭ লাখ মার্কিন ডলার অনুদান পাওয়া যায়। ইউএনডিপির অর্থায়নে পরিচালিত পুলিশ রিফর্ম প্রজেক্ট ও জাস্টিজ সেক্টর ফ্যাসিলিটি প্রকল্পে এ অর্থ ব্যয় হয়,যার অধীনে জেন্ডার বিশেষজ্ঞরা এই গাইডলাইন তৈরি করে থানায় থানায় পাঠান। কিন্তু তার কোনও ছাপ থানায় দেখা যায়নি।
বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা। মিরপুর থানায় মামলা করতে আসা এক নারীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন,থানায় নারী মামলা করতে এলে তাকে বসিয়ে রাখা হয়,মামলা করতে চাইলে কেন মামলা না করা ভাল তা বুঝানো হয়। এমনকি মামলার এজাহার লেখার সময় এমন সব অপ্রাসঙ্গিক গল্প বলতে থাকেন কর্মকর্তারা,যেখানে উচ্চারণের যোগ্য নয় এমন শব্দ অনায়াসে বলেন এবং তারপরই এমন ভাষা প্রয়োগের জন্য ক্ষমা চেয়ে নেন। এ যেন ‘সুশীল’ হয়রানি। সেখানে এসআই পদমর্যাদার এক পুলিশ কর্মকর্তাকে গাইডলাইনের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন,‘আমরা তো নারীদের সঙ্গে এমনিতেই খারাপ আচরণ করি না।’ খারাপ আচরণের কথা বলা হচ্ছে না,গাইডলাইনটা আপনারা কখনো পড়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমন কিছু একটা আছে শুনেছি, কিন্তু দেখিনি কখনো।
শেরে বাংলা নগর থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) এ কে আজাদ প্রথমে মনে করতে না পারলেও একটু পর বলেন,এধরনের একটা জিনিসের কথা শুনেছিলাম। থানায় এর কপি আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন,ওসি স্যার বলতে পারবেন। এটা সবার জানার কথা বলা হলে তিনি আর কথা বাড়াননি।
দুপুর ১২টায় শেরে বাংলা নগর থানা। মিরপুর থানার সেই নারীর অভিযোগ অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল। এমন অদ্ভূত সব গল্প এই প্রতিবেদককে বলা শুরু করলেন এক কর্মকর্তা যেটা প্রতিবেদক জানতেও চাননি। তিনি একের পর এক উচ্চারণ অযোগ্য শব্দ ব্যবহার করে গল্প করছেন আর বলছেন, ‘কিছু মনে করবেন না,আমি আপনাকে সত্যটা বলছি। এখানে কোন নারী পুলিশ সদস্যকে ডিউটি অফিসারের কক্ষে পাওয়া যায়নি।
বুধবার রাজধানীর আরও তিনটি থানায় গিয়ে একই চিত্র দেখা গেছে। কোথাও নারীদের বিষয়টি আলাদাভাবে ভাবার কোনও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। নারীর সঙ্গে আচরণের বিষয়ে গাইডলাইন সম্পর্কে কোনও ধারণা নেই। এমনকি মডেল থানাগুলোতেও কর্মরতদের এ বিষয়ে কিছু জানা নেই। যদিও পুলিশ রিফর্ম প্রোগ্রাম (২য় পর্যায়)প্রকল্পের আওতায় ২১টি থানাকে মডেল থানায় রূপান্তরের পরিকল্পনাই প্রধান ছিল,যেখানে নারীবান্ধব পরিবেশ থাকবে।
ইউএনডিপির জেন্ডার কনসালট্যান্ট হিসেবে পুলিশ সংস্কার প্রকল্পের দুই পর্যায়ে যুক্ত ছিলেন ফওজিয়া খন্দকার। গাইডলাইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন,পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে বের হওয়া সহজ নয়। সিনিয়র কর্মকর্তারা জেন্ডার প্রোগ্রামটাকে যতটা উৎসাহিত করেছেন মুখে,কার্যত ততটা হয়নি। আর হয়নি বলেই থানায় নারীরা গেলে তাদের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করতে হবে, কী উদ্যোগ নিতে হবে, সেসব নিয়ে আমরা গাইডলাইন তৈরি করে দিলেও সেটা সেভাবে তারা গ্রহণ করেননি।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন,নির্যাতিত নারীদের চিকিৎসা বা পুলিশের সহায়তা চাওয়াটাও যেন অপরাধ। বেশির ভাগ থানায় নারীদের কথা শোনার জন্য নেই নারী পুলিশের ব্যবস্থা। আমরা বারবার বলার পরও নির্যাতনের শিকার নারীকে অভিযোগ জানাতে হয় পুরুষ পুলিশের কাছে। এধরনের হয়রানিকে আমলেই নেয় না কর্তৃপক্ষ। ফলে থানার পরিবেশ বদল হয়নি এতটুকু। মডেল থানাগুলো পরিদর্শন করে সেখানে নারী পুলিশকর্মী হয়তো দেখা যায়,কিন্তু তারা তাদের পুরুষ সহকর্মী ছাড়া নিজেদের সিদ্ধান্তে কিছু করার ক্ষমতা রাখেন না।
/ইউআই/এমএসএম/