বরেন্দ্র অঞ্চলে সুপেয় পানির সঙ্কট নিরসনে ভূমিকা রাখবে সিএম+ মডেল: গবেষণা

পদ্মার বুকে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এতে করে সুপেয় পানির সঙ্কট প্রকট হচ্ছে। এছাড়া, ভূগর্ভস্থ পানিতে আয়রন ও আর্সেনিকের উপস্থিতি তো আছেই। এ সমস্যার সমাধানে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে খাবার পানির নানা ধরনের অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে এই এসব প্রকল্প টেকসই হচ্ছে না। এক্ষেত্রে কমিউনিটি ম্যানেজমেন্ট প্লাস (সিএম+) মডেল এ সঙ্কট সমাধানে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ বদরুল হাসান। 

মঙ্গলবার (১৭ জানুয়ারি) বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সেমিনার কক্ষে আয়োজিত ‘কমিউনিটি ভিত্তিক খাবার পানির অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা: বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলে কমিউনিটি ম্যানেজমেন্ট প্লাস মডেলের সম্ভাব্যতা পরীক্ষা’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন কালে তিনি এসব কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ গবেষণা অনুদানের আওতায় পরিচালিত গবেষণায় এই তথ্য উঠে আসে। 

এর আগে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় অঞ্চলে পরিচালিত গবেষণায় তিনি এই মডেল উদ্ভাবন করেন। এই উদ্ভাবনের মূল কথা হলো, সুপেয় পানি নিশ্চিতে শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নই শেষ নয়; তা টেকসই করতে হলে সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ দরকার। এজন্য সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতা, কমিউনিটি পর্যায়ে পারস্পারিক সুসম্পর্ক প্রয়োজন। সুপেয় পানির অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও ব্যবহারকারী উভয়ে মিলে সমন্বয়ের মাধ্যমে এই অবকাঠামোগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করবে। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন থাকবে। আর এই সমন্বয় সাধনে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। এই প্রক্রিয়াকেই তিনি সিএম+ মডেল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

উদ্ভাবিত মডেলের বিষয়ে এই পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ বলেন, সিএম+ মডেল দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রেক্ষাপটে কার্যকরী। কিন্তু দেশের অন্যান্য অঞ্চলে এই মডেলটি বাস্তবায়ন যোগ্য কিনা— তা যাচাই করতে বরেন্দ্র অঞ্চলে আমরা এই গবেষণা পরিচালনা করি। সেখানেও এ মডেল অনেকাংশে কার্যকরী হবে বলে প্রতিয়মান হয়েছে। আমাদের এই গবেষণা ফলাফল নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিবেচনা করা হলে বরেন্দ্র অঞ্চলে সুপেয় পানি নিশ্চিতে ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশা করি। এবং সেইসঙ্গে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৬নং লক্ষ্য (২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য সুপেয় পানির সরবারহ নিশ্চিত করা) এবং ডেল্টা প্লান বাস্তবায়নে কার্যকরি ভূমিকা রাখবে। 

ঢাবি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে আলোচক হিসাবে উপস্থিত ছিলেন পানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ। সেমিনারে বক্তব্য রাখেন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শান্তনু মজুমদার, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইন্টারন্যাশনাল ট্রেইনিং নেটওয়ার্কের পরিচালক (আইটিএন) পরিচালক অধ্যাপক ড. তানভীর আহমেদ এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. সাইফুর রহমান। এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সোহরাব হোসেন, অধ্যাপক ড. স ম আলী রেজাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পানি বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বীর আহমেদ। 

পানি বিশেষজ্ঞ কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ বলেন, দিনে দিনে হাইড্রো পলিটিকস গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আগামীতে পানি সঙ্কট এবং পানি দারিদ্রতা আরও প্রকট আকার ধারণ করবে। এক্ষেত্রে গবেষকের উদ্ভাাবিত পানি ব্যবস্থাপনা মডেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তিনি আরও বলেন, ‘এই মডেলে সামষ্টিক প্রচেষ্টার কথা বলা হয়েছে। এর পাশাপশি প্রাতিষ্ঠানিক তত্ত্বাবধান দরকার। সংশ্লিষ্ট সকলের মাঝে সচেতনতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আগামী প্রজন্মের জন্য পানি না রেখে গেলে তারা আমাদের অভিসম্পাত করবে।’

প্রকৌশলী মো. সাইফুর রহমান বলেন, উনি যে মডেলটি উদ্ভাবন করেছেন সেটাকে জীবন দিতে হবে। অর্থ্যাৎ বাস্তবায়ন করতে হবে। না হলে এই মডেলটি বইয়ের পাতাতেই থেকে যাবে। সুপেয় পানি নিশ্চিতে এক সময় কমিউনিটি ম্যানেজমেন্ট মডেলের কথা বলা হতো। কিন্তু তা এখন কাজ করছে না। কেন কাজ করতো না, সে বিষয়ে এই মডেলে তুলে ধরা হয়েছে এই গবেষণায়। এটা কার্যকর করার চিন্তা সংশ্লিষ্টদের আছে বলে তিনি জানান।     

অধ্যাপক ড. তানভীর আহমেদ বলেন, কোনও কিছু হলেই আমরা প্রযুক্তিকে দোষারোপ করি। কিন্তু আসলে আমাদের ব্যবস্থাপনারও অভাব রয়েছে। সেক্ষেত্রে উদ্ভাবিত মডেল গুরুত্বপূর্ণ। এই মডেলের সঙ্গে আরেকটি বিষয় যুক্ত করা যেতে পারে। তাহলো কার কতটুকু ভূমিকা তা তুলে আনা। যেমন সরকার, কমিউনিটি, স্থানীয় সরকার, বেসরকারি সংস্থা— সকলের ভূমিকা তুলে আনা।