মেলাকে ঘিরে ‘চাঁদরাতের’ ব্যস্ততা ম্লান হয়েছে দুশ্চিন্তায়

রাত পোহালেই শুরু হতে যাচ্ছে বাঙালির প্রাণের মেলা ‘অমর একুশে বইমেলা’। মেলা ঘিরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে প্রকাশনা সংস্থাগুলোর স্টল সাজানোর ব্যস্ততা এখন তুঙ্গে। তবে এর কোনও ছাপ নেই নতুন বই ছাপানোর ক্ষেত্রে। দেশের বইপাড়া হিসেবে খ্যাত বাংলাবাজারে প্রকাশনা সংস্থা, বাঁধাই ও ছাপা কারখানাগুলোতে অন্যান্য বছরের মতো নেই বইমেলার আগমুহূর্তের ব্যস্ততা।

বইমেলা শুরুর আগে আগেও বিশেষ কোনও ব্যস্ততা নেই বাংলাবাজারের ছাপাখানাগুলোয়

মঙ্গলবার (৩১ জানুয়ারি) বাংলাবাজার এলাকার ৩৭ নম্বর বাংলাবাজার, প্যারিদাস লেন, শিরিষ দাস লেন, পাতলা খান লেন, রূপচান লেন, জয়চন্দ্র ঘোষ লেন ঘুরে দেখা যায়, ছাপাখানা ও বাঁধাই কারখানাগুলোতে নেই ব্যস্ততা। আর দশটা দিনের মতো চিরাচরিত ছন্দেই চলছে বাংলাবাজার। ছাপাখানা ও বাঁধাই কারাখানাগুলোতে বইমেলার বইয়ের বদলে চলছে ধর্মীয় ও গাইড বইয়ের কাজ। ৩৭ নম্বর বাংলা বাজারেও সেই গতানুগতিক গাইড বই ও ধর্মীয় বই নিয়ে ছুটে চলেছেন শ্রমিকরা।

বইমেলা শুরুর আগে আগেও বিশেষ কোনও ব্যস্ততা নেই বাংলাবাজারের ছাপাখানাগুলোয়

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাগজের উচ্চমূল্যের প্রভাব পড়েছে বইমেলায়। কাগজের দামের কারণে বাড়ছে বইয়ের দাম। প্রকাশনা ও বই ভেদে বইয়ের দাম বাড়ছে ২০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত। প্রকাশকরা বইয়ের সংখ্যা বিগত বছরের তুলনায় ২০-৮০ শতাংশ কমিয়ে এনেছেন। এমননি এখনই মেলায় সব বই আনতেও চাচ্ছেন না কেউ কেউ। পাঠকের আগ্রহ বুঝে মেলায় বই আনার অপেক্ষা করছেন তারা। প্রকাশকদের মধ্যে শঙ্কা কাজ করছে, আদৌ বই কতগুলো বিক্রি হবে এবার।

বাংলাবাজারের ছাপাখানাগুলোয় চলছে গাইড বই ও ধর্মীয় বই ছাপার কাজ

জিয়নপুর বুক বাইন্ডিং ওয়ার্কসের সত্ত্বাধিকারী মো. ইউসুফ আলী বলেন, ‘কাগজের মূল্যের কারণে প্রকাশকরা কমিয়েছেন বইয়ের সংখ্যা। তারপরও যে বইগুলো মেলায় ছাড়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, মেলা শুরু হওয়া না পর্যন্ত তারা তার মধ্যে সব বইয়ের কাজে হাতও দিচ্ছেন না। ফলে আমাদের হাতে কাজ নাই। এই সময়ে রাত-দিন ২৪ ঘণ্টায় কাজ চলেছে আগে, শ্রমিক থেকেছে ৩০-৩৫ জন। কিন্তু এখন কাজ নেই। আমরা গাইড বইয়ের কাজ করছি। অপেক্ষায় আছি যদি মেলায় ভালো বিক্রি হয়, তাহলে অর্ডার পাবো। আমাদের তো কাজ দরকার।’

বাংলাবাজারের ছাপাখানাগুলোয় চলছে গাইড বই ও ধর্মীয় বই ছাপার কাজ

বিসমিল্লাহ বুক প্রেসের সত্ত্বাধিকারী বাবুল মিয়া বলেন, ‘এবছর বইমেলার কাজ পাইনি। ধর্মীয় বইয়ের কাজ করছি। বইয়ের দাম বাড়ছে। প্রকাশকরাও চিন্তায়। মেলায় কেনাবেচা হলে বইয়ের অর্ডার পেতে পারি। আগে ১০-১৫ প্রকাশনার বইয়ের কাজ পেতাম। সারাদিন-রাত কাজ করেও কুলাতে পারতাম না। এবার তো বুঝতেই পারছি না বইমেলা চলে আসছে।’

প্রকাশনা সংস্থাগুলোতে পাণ্ডুলিপি জমা হয়েছে আগেই। কাগজের উচ্চমূল্যের দোলাচালে এখন প্রকাশনা সংস্থার ব্যস্ততা কম্পোজ, প্রুফ দেখার। চলছে গ্রাফিক্সের কাজ, কাভার তৈরি, প্রচ্ছদ পছন্দর কাজ। প্রকাশনা সংস্থার কাজ শেষ হলেই বই ছুটছে ছাপাখানা থেকে বাঁধাই কারখানায়। তবে কাগজের উচ্চমূল্য ও সংকটে বাঁধা পড়েছে নতুন বইয়ের আগমনের এই সরল প্রক্রিয়ায়।

বইমেলার কোনও প্রভাব পড়েনি বাংলাবাজারের ছাপাখানাগুলোয়

জিনিয়াস পাবলিকেশনের ম্যানেজার আব্দুল বাতেন বলেন, ‘এবারের অবস্থা ভিন্ন। টাকা দিয়ে বসে থেকেও কাগজ পাওয়া যাচ্ছে না। তার ওপর কাগজের এত দাম। গতবারও ব্যস্ততায় ঘুমাতে পারিনি। এবার তো বই প্রেসে কিছু আছে, কিছু যাবে। এই অবস্থা।’

কবিতা প্রকাশনীর প্রকাশক নজরুল হায়দার বলেন, ‘মেলার মাঠ ও প্রেস দুই জায়গায়ই সময় দিতে হচ্ছে। তাই ব্যস্ত সময় যাচ্ছে। আমাদের ২০টা নতুন বই আসবে। তিন বই তৈরি হয়ে গেছে, বাকিগুলো প্রেসে। চেষ্টা করছি বাকি বইগুলো এক সপ্তাহের মধ্যে প্রস্তুত করার।’

বইমেলার কোনও প্রভাব পড়েনি বাংলাবাজারের ছাপাখানাগুলোয়

চারুলিপি প্রকাশনীর প্রকাশক হূমায়ন কবীর বলেন, ‘গতবার আমাদের নতুন বই ছিল ৫০টি, এবার ২৫টি। ১০টি বই প্রেসে যাওয়ার জন্য  প্রস্তুত। আমরা তো বই আনতেই চাচ্ছি। কিন্তু ৮০ গ্রামের কাগজের দাম ১৭০০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ৪০০০ টাকা। বইয়ের দাম যেটা ২০০ টাকা ছিল এবার হবে ৩০০-৩৫০ টাকা। দিন শেষে তো আমিও পাঠক। এত টাকা দিয়ে আর কয়টা বই কিনতে পারবো?’

ছবি: প্রতিবেদক