গুলশানের আগুন শর্ট সার্কিট থেকে, ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা সামান্য

রাজধানীর গুলশান-২ এ বহুতল আবাসিক ভবনে অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে; আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১০ জন। ভবনটিতে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত শর্ট সার্কিট থেকে হয়েছে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা।

তিনি জানান, ওই ভবনের চতুর্থ তলায় ডাকলাইনে প্রথমে আগুন লাগে। কিন্তু ১২ তলার ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ভবনটিতে আগুন নেভানোর তেমন কোনও সরঞ্জামাদি পাওয়া যায়নি। যাও আছে, তা কোনও কাজে আসেনি।

রবিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ৭টার দিকে গুলশান-২ নম্বরের ১০৪ নম্বর সড়কে মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপরীত পাশে ২/এ হোল্ডিংয়ের ‘জাকির মোশাররফ স্কাইলেন’ নামে ১৩ তলা অত্যাধুনিক ভবনটিতে আগুন লাগে। সম্মিলিত বাহিনীর প্রায় চার ঘণ্টা চেষ্টায় রাত ১১টার পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিট, সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী ও নৌ বাহিনীসহ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরা আসেন। এ সময় ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, স্বরাষ্ট্রসচিব মো. আবদুল্লাহ আল মাসুদ চৌধুরী ও ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাঈন উদ্দিন।

জানা গেছে, ভবনের ২৬টি ফ্ল্যাটের মধ্যে অধিকাংশ ফ্ল্যাটই বসবাসকারীদের নিজস্ব। তবে ভবনের প্রধান মালিক জাকির ও মোশাররফ নামে দুই বন্ধু। মোশাররফ মারা যাওয়ায় ভবনের পুরো দায়িত্ব জাকিরের হাতে। ওই সব ফ্ল্যাটে থাকেন ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। প্রতিটি তলায় আলিশান দুটি করে ফ্ল্যাট আছে। এর মধ্যে ওই ভবনে রয়েছে নিউ এইজ গার্মেন্টসের মালিক আরিফ ইব্রাহিমেরও ফ্ল্যাটও।

আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করা বারিধারা ফায়ার স্টেশনের এক কর্মী জানান, ভবনের চারতলার বৈদ্যুতিক তার থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। এতে পুরো ভবনে ধোঁয়া ছেয়ে যায়, সিঁড়ি ব্যবহার করে কেউ নামতে পারেনি। ফলে আগুন দ্রুত ওপরের দিকে ছড়িয়ে যায়। ১১ ও ১২ তলায় ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।

তিনি জানান, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা চারতলা থেকে আগুন নিয়ন্ত্রণে নিতে নিতে ওপরে ওঠে‌। পরে এসব ফ্লোরে আর আগুন ধরেনি। তবে ভবনের দুটি ফ্লোরে আগুন ছড়িয়ে পড়ার কারণ হচ্ছে অতিমাত্রায় ডেকোরেশন। এ ছাড়া আধুনিক ভবন হওয়া সত্ত্বেও ফায়ার সরঞ্জামাদি খুবই কম ছিল। আর যাও আছে, সেটা বৈদ্যুতিকের শত শত তারের পাশ দিয়ে দেওয়া। এতে আগুনে ওই সব ফায়ার সরঞ্জামাদি আগেই পুড়ে যায়। এ ছাড়া ওই ভবনের সামনে ছাড়া কোনও রাস্তা না থাকায় অন্য ভবনের ওপরের ভেহিক্যাল দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টা করা হয়।

আগুন নিয়ন্ত্রণে এলে ১২টার পরে ভবনের মালিক রোকসানা হোসেন, ফারজানা বাণু ও সাভরিনা সিদ্দিকসহ আরও কয়েকজন মালিক ও গুলশান থানার কাছে হস্তান্তর করেন ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্স। এ সময় ফায়ার সার্ভিস সদর দফতরে পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ১১ তলার প্রতিটি ফ্লোর আমার টিম দিয়ে সার্চ করেছি। ওখানে কোনও মরদেহ বা কোনও ভুক্তভোগীকে পাওয়া যায়নি। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার সময় কয়েকটি ফ্ল্যাটের দরজা ভাঙতে হয়েছে। কোনও ফ্লোরের ফ্ল্যাটে নষ্ট করা হয়নি।

উদ্ধার অভিযান শেষে ভবনের কয়েকজন মালিক ভবনের দায়িত্ব বুঝে নেন। এ সময় ভবনটি সিজ কররা হবে কি না এক নারীর প্রশ্নের উত্তরে গুলশান থানার পরিদর্শক শাহিনুর রহমান বলেন, ‌‘ওটা স্যার বলতে পারবেন।’

ফায়ার সার্ভিস এই কর্মকর্তা বলেন, ‘সাধারণত আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পরে ঘটনাস্থল ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট পরিদর্শন করে ভবন কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের কাছে বুঝে দেন। তারা দেখে বুঝে নেন। এখন পুলিশ আজ ভবনে কাউকে উঠতে দেবে কি না, সেটা তাদের বিষয়। আমরা বাসা মালিক ও পুলিশের উপস্থিতিতে মৌলিকভাবে বুঝিয়ে দিই।’

আগুন নিয়ন্ত্রণ আসার পরে ভবনের নিচে সাভরিনা সিদ্দিক নামে সাততলা ফ্ল্যাটের মালিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই ভবনের সাত তলায় আমার ফ্ল্যাট, সেখানে কিছুই হয়নি। আমি বাসার বাইরে ছিলাম, ৭টার দিকে ফোন পেয়েছি ভবনে আগুন লাগছে। আমার পরিবারের সবাই ভালো আছে। কারোর কোনও সমস্যা হয়নি।’

তিন তলা এ ফ্ল্যাটের মালিক রোকসানা হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগুন লাগার সময় আমরা বাসাতেই ছিলাম। বাসার দরজার নিচে দিয়ে বাসায় ধোঁয়া আসা দেখে, আমার ছেলে দরজা খুলে দেখে এই অবস্থা। তারপর বাসা থেকে যে কীভাবে নেমেছি, সেটা আর বলতে পারবো না। আমার পরিবারের সবাই ভালো আছে।’

ভবনে অবস্থান করা অনেকেই জানান, চারতলায় আগুন লাগার পরে পুরো ভবনে ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যায়। এ সময় অনেকে ভবনের লিফট ব্যবহার করে নেমে আসেন‌। কিন্তু আগুন যখন পাঁচ ও ছয় তলায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন লিফট বন্ধ করে দেওয়া হয়। 

ভবন বুঝে নেওয়ার পরে ফারজানা বানুসহ আরও বেশ কয়েকটি পরিবার সামান্য জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখা গেছে। এ সময় ফারজানা বানু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আজ তো ফ্ল্যাটে থাকার কোনও অবস্থাই নেই। তাই পরিবার নিয়ে বোনের বাসায় চলে যাচ্ছি। আর ফ্ল্যাটের যেই অবস্থা কয় মাস পরে উঠতে পারবো জানি না।’

নিউ এইজ গার্মেন্টসের মালিক আরিফ ইব্রাহিমের ছয়জন নিরাপত্তা প্রহরী ছুটে আসেন ভবনের নিচে। তারা জানান, আরিফ ইব্রাহিম তার স্ত্রী এক ছেলে ও মেয়েসহ একজন কাজের মানুষ নিয়ে ভবনের নয়তলায় নিজস্ব ফ্ল্যাটে থাকতেন। আগুনে গুরুত্বর আহত হয়ে প্রথমে ল্যাব এইডে পরে শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন আছেন। তবে স্ত্রী ও সন্তানদের অবস্থা ভালো আছে।

বৃহত্তর ঢাকা জেলার ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক আক্তারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অত্যাধুনিক ভবনের ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটের অতিরিক্ত ডেকোরেশনের কারণে আগুনের এই ভয়াবহতা। আমরা চার তলা থেকে আগুন নিয়ন্ত্রণে নিতে নিতে উপরে দিকে উঠেছি। এ সময় আমাদের আরেকটি ইউনিট ফ্ল্যাট থেকে মানুষদের উদ্ধার করেছে।’

আক্তারুজ্জামান আরও বলেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পরেও অবজারভেশন (পর্যবেক্ষণ) কারার জন্য সকাল পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট থাকবে। তাদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এখানে অবস্থান করবে।

ফায়ার সার্ভিসের বারিধারা ইউনিট এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, চারতলার পর থেকে ডাকলাইনে আগুন লাগে। আর সলিট ফ্লাটে ধোঁয়া বেশি হয়, গ্যাস প্রচুর সৃষ্টি হয় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড সৃষ্টি করে। এ জন্য ডাকলাইনে আগুন বাড়ছে‌। প্রথমে ভবনের আশপাশে ধোঁয়ায় কেউ দাঁড়াতে পারেননি। সিঁড়ি দিয়ে ওঠাও যায়নি।

ক্ষয়ক্ষতি

ভবনের চার তলা থেকে শুরু করে ১২ তলা পর্যন্ত ডাকলাইন (মূল বৈদ্যুতিক লাইন) বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ১১ ও ১২ নম্বর ফ্লোর পুরে গেছে। আর ৭ থেকে ১০ তলা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে টাকার পরিমাণে ক্ষয়ক্ষতি জানা যায়নি।

ভবনে অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা ভঙ্গুর

ভবন নির্মাণের আগে ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া স্টাকচার (আগুন নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র) আছে কি না, জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, ওটা পায়নি। ওটাকে হাইড্রেন লাইন ভবনে নেই। তবে সিগন্যাল বালফ আছে। এ ছাড়া আগুন নিয়ন্ত্রণে বাসার যেই আলাদা সেফটি ট্যাংক থাকে, সেটাই পানি নেই। আমরা পানি দিলে ওরা কাজ করবে। কিন্তু ভবনের কাপ্তাইয়েন (পানির লাইন) দিয়ে কাজ করবো সেই সুযোগ নেই।

ভবনে সাইড ইক্যুইপমেন্ট ছিল কি না জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, সাইড ইকুইপমেন্ট যা ছিল কাজ করেনি। এ ছাড়া যথেষ্ট ইকুইপমেন্টও নাই ভবনে। আর ফায়ার ইকুইপমেন্ট ভবনের যেখানে লাগানো, সেখানে লাগানোর কোনও নিয়ম নেই। তারপরও সেখানে লাগানো। এতে ফায়ার ইকুইপমেন্ট কোনও কাজে আসেনি। ডাকলাইনের পাশে হওয়ায় সব পুড়ে গেছে আগেই।

উৎসুক জনতায় উদ্ধার কাজে বাধা

গুলশানে আগুনের ঘটনায় ভবনের আশপাশে উৎসুক জনতার ভিড়ের কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে উদ্ধারকাজ। আগুন নেভানোর কাজে আসা ফায়ারের যানগুলো ঘটনাস্থলে ঢুকতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাঈন উদ্দিন।

এ সময় দেখা গেছে, ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলো আগুন নেভানোর কাজে আসা-যাওয়া শুরু করে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে মানুষ মোবাইল ফোনে ঘটনার ছবি তোলা ও ভিডিও করা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সড়কে। এ ছাড়া অনেকে কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্স এনে রাখে। মানুষের ভিড়ের কারণে এসব কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এ সময় ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের হ্যান্ডমাইকে সবাইকে সরে যেতে বলা হচ্ছে। এতেও মানুষ সরছে না। ভিড় সামলাতে হিমশিম, বাধাগ্রস্ত উদ্ধারকাজ এক উদ্ধারকর্মী বলছেন, ‘কেউ কোনও পাইপের ওপর দাঁড়াবেন না। দয়া করে ভিড় করবেন না। সরে যান। উদ্ধারকাজে সহায়তা করেন।’ বারবার ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে মাইকে ওই ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে দেখা গেছে।

গুলশানে আগুনের ঘটনায় হতাহত

গুলশান-২ নম্বরের বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তিন জনসহ বেশ কয়েকজন লাফিয়ে পড়ে আহত হয়েছেন। এ ছাড়া আগুনে দগ্ধ ও লাফিয়ে পড়াদের মধ্যে চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ভবনের বিভিন্ন তলা ও ছাদ থেকে ২২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পুরুষ ৯, নারী ১২ ও এক নবজাতক রয়েছে। এ ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।