সব দোষ কি নারীর পোশাকেই?

প্রতিনিয়তই পোশাকের জন্য নারীদের হেনস্তা হতে হয়। পড়তে হয় বিড়ম্বনায়। রাস্তায় কিংবা কর্মক্ষেত্রে অথবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে  কোনও জায়গায়ই বাদ যায় না। পোশাক নিয়ে নানা বিড়ম্বনা ও এর প্রতিকারের কথা বলতেই ওয়াও ফেস্টিভ্যালে দ্বিতীয় ও শেষ দিনের এক প্যানেল ডিসকাশনের আয়োজন করা হয়। যার শিরোনাম "সব দোষ কি নারীর পোশাকেই?"

শনিবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর জাতীয় শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত এই ডিসকাশনের সঞ্চালনা করেন বাংলা ট্রিবিউনের বিশেষ প্রতিনিধি উদিসা ইসলাম। আলোচক হয়ে উপস্থিত ছিলেন—মডেল ও উপস্থাপিকা ইসরাত জাহান পায়েল, ডিবিসি নিউজের অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর নাজনীন মুন্নী, নারী অধিকার  কর্মী অ্যাডভোকেট সানাইয়া আনসারী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক জাহিদুল ইসলাম সানা।

আলোচনায় নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে ইসরাত জাহান পায়েল বলেন, আমি নিয়মিতই হেনস্তার শিকার হই।  সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক অপ্রীতিকর কমেন্ট পাই। সম্প্রতি আমার চুল বয়কাট করার পর অনেক কথা শুনতে হয়েছে। আমেরিকাতে থাকার সময় আমার খাবার নিয়ে কিছুটা সমস্যা হয়েছিল, তাই আমার ওজন কমে যায়। কিন্তু আমার কাছের এক মানুষই আমাকে বলে যে আমি এডিক্টেড কিনা!  এভাবে কোনও কিছু না জেনে মন্তব্য করা মোটেই উচিত না।

তিনি বলেন, আমরা শহরে থাকি আমাদের পোশাকে নাকি সমস্যা আছে। কিন্তু যারা গ্রামে থাকে  তাদের কী সমস্যা?  তাদের কেন হেনস্তার শিকার হতে হয়, ধর্ষণ হতে হয়?  আসলে সমস্যা আমার পোশাকে না,  সমস্যা আপনার মস্তিষ্কে।

নারীকে তার কাজের মধ্য দিয়ে দেখার কথা বলে তিনি বলেন, নারীকে তার কর্ম দিয়ে দেখবেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, বিরোধীদলীয় নেত্রী নারী, স্পিকার নারী। সম্প্রতি বাংলাদেশের এক নারী নাসায় গিয়েছেন। কালো-ফর্সা, লম্বা-খাটো,  মোটা-চিকন এসব কথা কেন আসবে?  আমি একজন নারী৷ একজন মানুষ এটাইতো মুখ্য।

ডিবিসি নিউজের অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর নাজনীন মুন্নী বলেন, একজন নারী ভালো নাকি খারাপ তা নাকি বিচার হয় তার পোশাকে। আমি যত ভালো গুণেরই হই না কেন আমার পোশাকে সব নির্ধারণ করা হয়। অথচ আপনি যখন হাফপ্যান্ট পড়ে আমার সামনে দিয়ে যান আমার অস্বস্তি লাগে। কিন্তু আমি তাকিয়ে থাকি না৷ চোখ নামিয়ে নেই। কিন্তু আমাদের দেখতে যদি অশ্লীল লাগে আপনারা কিন্তু তাকিয়ে থাকেন এবং কমেন্ট করতেই থাকেন। যতক্ষণ না আমাকে একজন খারাপ মেয়ে হিসেবে প্রমাণ করা যায়। 

গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, সত্যি কথা বলতে গণমাধ্যম এখন দেখে পাবলিক কী খায়। সে অনুযায়ী চলে। কিন্তু গণমাধ্যম যদি একপেশে হয়ে যায় তাহলে এটা সমাজের জন্য ক্ষতিকর।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হেনস্তার শিকার হয় নারীরা। এ প্রসঙ্গে মুন্নী বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটা সমস্যা আছে। সামনাসামনি কাউকে কিছু বললে সেটা আশেপাশের কয়েকজন জানে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনও কমেন্ট করলে ১৬ কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তাই কাউকে কমেন্ট করার আগে ভেবে করুন। যাতে সে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

নারী অধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট সানাইয়া আনসারী বলেন, আমাদের সংবিধানে বলা আছে—আপনি স্বাধীন দেশের নাগরিক। এখানে নারী কিংবা পুরুষের কথা উল্লেখ নাই। কে কেমন পোশাক পড়বে এটা একান্তই তার ব্যাপার।

তিনি আরও বলেন, আমরা যদি হিপোক্রেসি কমিয়ে ফেলি তাহলে উপকার হবে। আমি কী বলছি আর কী করছি—দেখা উচিত। যা বলছি সেটাই করা উচিত।

আলোচনায় নারীদের হেনস্তা হওয়ার পেছনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোনও সমস্যা আছে কিনা এই প্রসঙ্গে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক জাহিদুল ইসলাম সানা বলেন, এইযে নারীরা হেনস্তার শিকার হচ্ছে—এটার মধ্যে আমি  প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমস্যা দেখি না।  এখানে পারিবারিক শিক্ষাটা জরুরি।  পরিবারের একটা প্রভাব থাকে, যেটা সন্তানের ওপর পড়ে।

নারীদের গায়ের বর্ণ নিয়ে বৈষম্যের কথা তুলে তিনি বলেন, সুন্দর ব্যাপারটা কিন্তু আপেক্ষিক। ফর্সা হলেই সুন্দর বা কালো হলেই অসুন্দর এটা বলা যাবে না। আবার একজন মেয়ে কালো বলে তাকে তার যোগ্যতা প্রমাণের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে এমন কিন্তু না। কালো বা ফর্সা যেই মেয়েই হোক না কেন সবাইকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। এখানে রঙ মুখ্য না, আমরা সমাজে কতটুকু অবদান রাখতে পারছি সেটাই প্রধান।