শিশুদের কল্যাণে শহর পেরিয়ে পাহাড়ে যে তরুণী

‘ঢাকাতে সব ধরনের সুযোগ সুবিধা আছে, যেটা পাহাড়ে কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলে নেই। তাই আমি মনে করি সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর জন্য কাজ করা আমাদের সবারই দায়িত্ব। সেই দায়িত্বের থেকেই গারো ও হাজং সম্প্রদায়ের কল্যাণে কাজ করছি’-কথাগুলো বলছিলেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শিশুদের শিক্ষা ও কল্যাণে নিরলস কাজ করে যাওয়া সুলতানা রাজিয়া।    

তিনি মনে করেন, ‘প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সমাজে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে পারলে তারা নিজেরাই নিজেদের কল্যাণ করতে পারবে, নিজেদের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে পারবে।’

এ বিষয়ে সুলতানা রাজিয়া বলেন, ‘নেত্রকোনার গারো এবং হাজং পরিবার সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি যে তারা সবাই কম বেশি ডে-লেবার এবং কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের প্রত্যেকের পরিবারে শিশুদের মধ্যে ছেলেদের বয়স ৭-৮ হলেই বাবার সঙ্গে ডে-লেবার হয় আর মেয়েদের ১২-১৪ বছর বয়সের মধ্যেই বিয়ে দেওয়া হয়। আমি ভাবতে থাকি শুধু আর্থিক সহায়তায় তাদের জীবনে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তখন খোঁজ নিয়ে জানতে পারি এই গোত্রের  ৯৯ শতাংশ মানুষ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত।’

তিনি বলেন, ‘গারো ও হাজং শিশুদের আগ্রহ থাকলেও অভাবের কারণে বিদ্যালয় পর্যন্ত যেতে পারে না। তাদের জন্য শিক্ষা গ্রহণ কীভাবে সহজ করা যায় এ নিয়ে কাজ শুরু করি। ইতোমধ্যে নানা আয়োজনে ক্ষুদ্র এই জাতিগোষ্ঠীর লোকজনের মাঝে শিক্ষার নতুন দিক উন্মোচনের চেষ্টা করেছি। তারই ধারাবাহিকতায় এখানে একটি স্কুল করতে চাচ্ছি। কেননা পুরা গ্রামে একটাই প্রাইমারি স্কুল-সেটা হলো বারোমারি প্রাইমারি স্কুল। আদিবাসী পরিবারের অনেকেরই সেই স্কুলে বাচ্চাদের পড়ানোর সামর্থ নেই। তাই আমরা চাচ্ছি আমাদের যে স্কুলটা হবে সেখানে ১০০ থেকে ১২০ জন বাচ্চা ফ্রি পড়ালেখা করবে।’

করোনাকালে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শিশুদের নিয়ে কাজ করার আগ্রহ সৃষ্টি হয় জানিয়ে রাজিয়া সুলতানা বলেন, ‘২০২০ সালে কোভিড-১৯ এর শুরুতে আমি কিছু প্রকল্প হাতে নেই। যেমন সুবিধাবঞ্চিতদের মাঝে মিল-শেয়ারিং প্রজেক্ট। তখন মনে হলো বাংলাদেশিদের জন্য তো অনেকেই কাজ করে, কিন্তু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের খোঁজ কী কেউ রাখছে? এই সময়ে তো তাদের সহযোগীতা আরও বেশি প্রয়োজন। আর তখনই ইগনাইটিং হিউমিনিটি নামে একটি প্রকল্প হাতে নিই গারো এবং হাজং পরিবারদের জন্য। প্রকল্পটি শুরু করি নেত্রকোনা জেলার বারোমারই উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামে একশর বেশি গারো এবং হাজং পরিবারের জন্য। আমি ৩০টির বেশি পরিবারের পাশে থাকার চেষ্টা করি। বলতে গেলে ২০২০ সাল থেকে তাদের সঙ্গে আমার গল্পটা শুরু।’

বারবার ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর কাছে ছুটে যাওয়ার প্রসঙ্গে এই সমাজকর্মী বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয় আমরা সবাই প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই আদিবাসী মানুষগুলো একদম প্রকৃতির খুব কাছেই থাকে। মানুষগুলো খুব অল্পেই খুশি থাকে। তাদের কাছ থেকে শেখার অনেক কিছু আছে। আমি যে কয়দিন তাদের সঙ্গে ছিলাম তাদের জীবন সম্পর্কে অনেক কিছু শিখেছি। তারা কীভাবে জীবনকে দেখে এবং কীভাবে এত কম সুবিধা থাকার পরেও ভালো থাকেন। আমি বলতে চাই আদিবাসি মানুষগুলো, তাদের সংস্কৃতি, শিশুদের সুন্দর আঁকাআঁকিগুলো আমাকে তাদের জন্য কাজ করতে অনেক বেশি অনুপ্রেরণা দিয়েছে।’

একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে নানা প্রতিবন্ধকতা আসলেও তা এড়িয়েই কাজ করে যাচ্ছেন অদম্য সুলতানা রাজিয়া। এ প্রসঙ্গে তার ভাষ্য, ‘ভালো কাজ করতে গেলে অনেক ধরনের প্রতিবন্ধকতা আসে, সেটা মাথায় নিয়েই কাজ করতে আসা। আমার কোনও কাজে মানুষের জীবনে একটু পরিবর্তন দেখতে পেলে তখন চ্যালেঞ্জটাকে অনেকটাই সার্থক মনে হয়। প্রতিবন্ধকতা যেমন ছিল তেমন সাপোর্টও পেয়েছি। স্থানীয়দের অনেক ধরনের সহযোগিতা পেয়েছি।’

ইচ্ছাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া

জনকল্যাণে কিছু করার তাড়না থেকেই কাজ শুরু করা। পরবর্তীতে তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। জনসেবায় সুলতানা রাজিয়া গঠন করেন ‘লাইটশোর ফাউন্ডেশন’ নামে একটি সংগঠন। সংগঠনটির মধ্য দিয়ে নারীদের মাসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা, স্টেম এডুকেশন, জলবায়ু পরিবর্তন, নারী ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করেন তিনি। ইতোমধ্যে ‘লাইটশোর’-এর মাধ্যমে মাসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিষয়ক সচেতনতামূলক ১৮টি ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিশেষ শিশুদের স্কুলে স্যানিটারি ন্যাপকিন ডিসপেনসার বসানোর পাশাপাশি খুলনায় ৬টি স্কুল-কলেজ এবং মাদ্রাসায় ন্যাপকিন ডিসপেনসার বক্স বসানো হয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে মেয়েদের হাতের নাগালে স্যানিটারি ন্যাপকিন সহজলভ্য করার জন্য এই প্রজেক্ট চলমান থাকবে বলেও জানান সংগঠনটির উদ্যোক্তা সুলতানা রাজিয়া।

তিনি বলেন, ‘আমি পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য কাজ করতে চাই। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে দেখছি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণ-তরুণীদের মনোবল ও কাজ করার স্পৃহা রয়েছে। তাদের শুধু দরকার সঠিক প্রশিক্ষণ ও দিক-নির্দেশনা। এই ভাবনা থেকেই ২০১৯ সালে ধীরে ধীরে লাইটশোরের যাত্রা শুরু করি।’