অবিবেচনাপ্রসূত নিয়ন্ত্রণমূলক বিধানে ক্ষতিগ্রস্ত হবে অর্থনীতি: টিআইবি

উপাত্ত সুরক্ষা আইনের খসড়ায় সরকারি নজরদারি আর ভিন্নমত দমনের ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। পাশাপাশি দেশের ভেতরে উপাত্ত মজুতের অবিবেচনাপ্রসূত বিধান অপপ্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে মনে করে টিআইবি।

সোমবার (১৭ এপ্রিল) রাজধানীর ধানমন্ডির টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত ‘উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৩ (খসড়া): টিআইবির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের ও টিআইবির ডেটা প্রোটেকশন অফিসার ড. মো. তরিকুল ইসলাম।

সংবাদ সম্মেলনে ‘উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৩’-এর খসড়ার ওপর টিআইবির পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন সংস্থাটির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক শেখ মনজুর-ই-আলম।

টিআইবি জানিয়েছে, এ ধরনের আইনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতি হলো কেবল মাত্র একক ব্যক্তি (জীবিত ব্যক্তি) এর আওতায় আসবে। অথচ আলোচ্য খসড়াতে ‘ব্যক্তি’ অর্থে একক ব্যক্তির পাশাপাশি আইনগত ব্যক্তিসত্তা, সংস্থা, অংশীদারি কারবার, কোম্পানি, সমিতি, করপোরেশন, সমবায় সমিতি, প্রতিষ্ঠান বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থাকেও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে উপাত্তধারী, নিয়ন্ত্রক, প্রক্রিয়াকারী এবং নজরদারির জন্য প্রস্তাবিত উপাত্ত সুরক্ষা এজেন্সি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। সবাই ‘ব্যক্তি’ হওয়ায়, ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষিতে সুরক্ষা এজেন্সিসহ সবাই উপাত্তধারী, প্রক্রিয়াকারী ও নিয়ন্ত্রক হতে পারে। কার্যত ব্যক্তির সংজ্ঞার ব্যাপকতা আলোচ্য আইনটিকে একটি অবাস্তব অবস্থানে নিয়ে গেছে।

নির্ভরযোগ্য গবেষণায় দেখা গেছে, উপাত্ত স্থানান্তরের ওপর কী ধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হবে, তার ভিত্তিতে দেশের ডিজিটাল রফতানি ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। প্রবৃদ্ধির হার কমতে পারে শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং বিদেশি বিনিয়োগের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘ইতোপূর্বে টিআইবি উপস্থাপিত কোনও কোনও সুপারিশ বিবেচনায় নিলেও খসড়া আইনের মৌলিক ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোয় সরকার নিজের অবস্থানে অনড় রয়েছে, যা উদ্বেগজনক। বিশেষ করে এই আইনের মূল লক্ষ্য ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার যে উদ্দেশ্য, তার পরিবর্তে এটিকে ব্যক্তিগত তথ্যের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ব্যাপক সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। বৈশ্বিক চর্চা উপেক্ষা করে খসড়ায় এই আইনের মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার মৌলিক অধিকার নিশ্চিতের পরিবর্তে লঙ্ঘনের সমূহ ঝুঁকি বর্তমান খসড়ায়ও রাখা হয়েছে। ব্যক্তিগত তথ্যের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও প্রাধান্য অনুযায়ী বিন্যাসের অনুপস্থিতি ও এর ফলে এই আইনের যথেচ্ছ ব্যবহারের সম্ভাবনা যার উদাহরণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি কর্তৃত্বাধীন তথ্য সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার যে প্রস্তাব রাখা হয়েছে, তা স্বার্থের দ্বন্দ্বে দুষ্ট ও বৈশ্বিক চর্চার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একইভাবে যে হারে এই আইনের অসংখ্য অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যার ক্ষমতা বিধি প্রণয়নের মাধ্যমে সরকারের হাতে একচ্ছত্রভাবে অর্পণ করা হয়েছে, তার ফলে সরকার চাইলে ইচ্ছেমতো মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যের উদ্দেশ্যমূলক অপব্যবহার ও বাকস্বাধীনতা ও ভিন্নমত দমন এবং নজরদারির জন্য এই আইনকে ব্যবহার করতে পারবে। এসব উদ্বেগ নিরসনে টিআইবি উপস্থাপিত সুপারিশমালা বিবেচনায় নিয়ে খসড়াটি ঢেলে সাজানোর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই।’

ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয়টি নজরদারি জন্য সরকারের নিয়ন্ত্রণনের বাইরে একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের দাবি জানানো হলেও, আলোচ্য খসড়ায় উপাত্ত সুরক্ষা এজেন্সি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে, যার নিয়োগ দেবে সরকার। সরকার নিজেই যেখানে উপাত্ত ব্যবহারকারী ও প্রক্রিয়াকারী, সেখানে সরকার যে আইনটি যথাযথভাবে মানছে, সেটি আরেকটি সরকারি সংস্থা নিশ্চিত করবে, এমনটা ভাবা অবাস্তব। পাশাপাশি, দেশের সীমানার ভিতরে উপাত্ত মজুত করার বিধান রেখে কার্যত উপাত্তের ওপর নজরদারির ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সরকারের হাতে রাখা হয়েছে। সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে থাকা উপাত্ত সুরক্ষা এজেন্সির প্রচণ্ড ক্ষমতা এবং এর বিপরীতে অপব্যবহার রোধের কার্যকর কোনও ব্যবস্থা না থাকায়, আলোচ্য খসড়াটি নিশ্চিতভাবে জনগণের সংবিধানস্বীকৃত বাক্স্বাধীনতা ও গোপনীয়তার অধিকার ক্ষুণ্ন করবে।

এ ছাড়া খসড়ায় বলা হয়েছে, কোনও কোম্পানি এই আইনের অধীন কোনও অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে কোম্পানির প্রত্যেক মালিক, প্রধান নির্বাহী, কর্মচারী বা প্রতিনিধি উক্ত অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবেন, যদি না তিনি প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে সেই অপরাধ তার অজ্ঞাতসারে হয়েছে বা অপরাধ রোধ করার জন্য তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। এই ধারার মাধ্যমে ফৌজদারি আইনে অপরাধ প্রমাণের দায়সংক্রান্ত নীতির সরাসরি বিপরীত ব্যবস্থার প্রস্তাব করা হয়েছে।

আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক শেখ মনজুর-ই-আলম বলেন, ‘নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সব প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যমসহ দেশি-বিদেশি সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য আইনগত ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির প্রয়োগের বিধান রাখার কারণে এই ঝুঁকি কেবল আর্থিক দণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর ফলে কার্যত গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর শুধু কণ্ঠরোধ নয়, বরং পঙ্গু করে ফেলার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

টিআইবি মনে করে বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরে সঙ্গে ধারাবাহিক মতবিনিময় চলমান রেখে আলোচ্য খসড়াটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে কর্তৃপক্ষ।