অধ্যাদেশ বাতিলের কারণ আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক প্রভাব: টিআইবি 

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট 
০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৫:১৮আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৫:১৮

অধ্যাদেশ বাতিলের পক্ষে যেসব যুক্তি তুলে ধরা হচ্ছে, তার অনেকটাই আমলাতন্ত্র থেকেই এসেছে বলে জানিয়েছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, “অধ্যাদেশ আইন হিসেবে কার্যকর না হওয়ার পেছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করছে, একটি আমলাতন্ত্র ও আরেকটি রাজনৈতিক প্রভাব।” এতে প্রমাণ হয়, এখনও দেশের নীতিনির্ধারণে আমলাতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলেও জানান তিনি। 

সোমবার (৬ এপ্রিল) টিআইবি কার্যালয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে প্রণীত কতিপয় অধ্যাদেশ বাতিল ও পরিবর্তন বিষয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এসব কথা বলেন। 

তিনি বলেন, “বর্তমানে অধ্যাদেশ নিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা মূলত অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধের ফল, যার উৎস রাজনৈতিক অঙ্গন। একই সঙ্গে এ প্রক্রিয়ায় আমলাতন্ত্রের ওপরও নির্ভরতা রয়েছে। অধ্যাদেশ বাতিলের পক্ষে যেসব যুক্তি তুলে ধরা হচ্ছে, তার অনেকটাই আমলাতন্ত্র থেকেই এসেছে। এতে প্রমাণ হয়, এখনও দেশের নীতিনির্ধারণে আমলাতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।” 

নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, “বর্তমান সময়টা দুদকের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। দুদক কখনোই পুরোপুরি কার্যকর ছিল না, তবে বর্তমানে নেতৃত্বের অভাবে প্রতিষ্ঠানটি আরও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। কমিশন না থাকায় নতুন কোনও সিদ্ধান্তও নেওয়া যাচ্ছে না, যা উদ্বেগজনক।” তিনি দ্রুত দুদকের নতুন অধ্যাদেশ সংশোধন ও নতুন কমিশন গঠনের দাবি জানান। 

সংগঠনটি জানায়, পুলিশকে একটি জনবান্ধব এবং একটি পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে যে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পুলিশ কমিশন গঠন প্রয়োজন তার কোন প্রতিফলনই অধ্যাদেশটিতে হয়নি। যা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে প্রস্তাবিত বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলের সম্মতিতে জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত সুপারিশ ও সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

টিআইবি আরও বলছে, “পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পুলিশ কমিশনের প্রত্যাশা পদদলিত করে এমনকি ‘স্বাধীন’ বা ‘নিরপেক্ষ’ শব্দগুলো ব্যবহার না করে শুধুমাত্র একটি ‘সংবিধিবদ্ধ সংস্থা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে এর গঠন, কার্যপরিধি ও প্রক্রিয়া সংক্রান্ত বিধানসমূহ এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে প্রস্তাবিত বিএনপি ও সব রাজনৈতিক দলের সম্মতিসহ জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত সুপারিশ ও সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।” 

অন্যদিকে এ অধ্যাদেশের বলে যদি পুলিশ কমিশন গঠিত হয় তবে তা হবে সম্পূর্ণভাবে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশি ও প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের কর্তৃত্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠান, যা এ ধরনের কমিশনের মৌলিক উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হবে।

পুলিশ কমিশন গঠনে পুলিশ কমিশনের সদস্য হিসেবে একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা (গ্রেড-১) ও একজন সাবেক পুলিশ সদস্যকে (গ্রেড-১) অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ সৃষ্টি এবং সাবেক পুলিশ সদস্যকে কমিশনের সদস্য সচিবের কর্তৃত্ব প্রদান করা করা হয়েছে, যা বাংলাদেশ তথা বৈশ্বিক অভিজ্ঞতায় সম্পূর্ণ অভূতপূর্ব। এভাবে সাবেক পুলিশ সদস্যকে সদস্য-সচিবের কর্তৃত্ব প্রদান করে প্রস্তাবিত কমিশনের চেয়ারপার্সন এবং অন্য কমিশনারদের পদমর্যাদা ও কর্ম-সক্ষমতাকে খর্ব করা হয়েছে। একই সঙ্গে কমিশনের চেয়ারম্যানের পদমর্যাদা তার অবসর গ্রহণের পূর্বের পদমর্যাদার সমরূপ করা এবং সদস্যদের পদমর্যাদা নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারকে প্রদান করা হয়েছে। যার ফলে কমিশনের স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, কমিশনের নিরপেক্ষতাকে পদদলিত করা ও কমিশনে সরকার এবং নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা পালনের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। 

এছাড়া পুলিশ কমিশনের চেয়ারপারসন ও সদস্য নিয়োগের বাছাই কমিটির গঠন ও কর্মপদ্ধতি পরিপূর্ণভাবে আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে, যার ফলে কমিশন গঠন ও কাজে ক্ষমতাসীন সরকারের পরিপূর্ণ কর্তৃত্ব ও স্বার্থের দ্বন্দ্বের ক্ষেত্র সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হয়েছে। সরকারকে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোনও ব্যক্তি বা সরকারি কর্মচারীকে কমিশনে প্রেষণে নিয়োগ করার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। প্রথম তিন বছর এই সংখ্যার কোনও সীমা নির্ধারণ করা হয়নি এবং পরবর্তী সময়ে ৩০ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলা হলেও সরকারি নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখার জন্য এ হারও যথেষ্টের চেয়ে বেশি। 

আরও বলা হয়, জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশটিতে এমন একটি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠনের কথা বলা হয়েছে যে একই সঙ্গে তথ্য আন্তঃপরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে। অর্থাৎ কর্তৃপক্ষ একইসঙ্গে নিয়ন্ত্রক ও সেবা দাতা, যা স্বার্থের সংঘাত তৈরি করবে।

ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ আলোকে সব প্রকার উপাত্তের (ডেটা) ব্যবস্থাপনা, আন্তঃপরিচালন এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আলাদা এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে অর্পণ করা হয়েছে জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের হাতে। আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা অনুযায়ী সাধারণত এই ধরনের কর্তৃপক্ষ উপাত্ত সুরক্ষা আইনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গঠিত হয়।

জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তার দায়িত্ব পালন ও কার্যসম্পাদনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবে বলা হলেও এই কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা বাছাই করবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন একটি কমিটি। যার ফলে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই প্রক্রিয়ায় সরকারের পছন্দ এবং অনুগত লোকজনই এই সুযোগ লাভ করবেন বলে তাদের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। 

/আইএ/এসটি/ 
সম্পর্কিত
মানবাধিকার কমিশনকে অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার পথে হাঁটছে সরকার: টিআইবি 
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হলে গণমাধ্যম বেশি চাপে পড়বে: ইফতেখারুজ্জামান 
দুদকের সংস্কারের আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী: ড. ইফতেখারুজ্জামান 
সর্বশেষ খবর
নিখোঁজ ব্যবসায়ীর হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার
নিখোঁজ ব্যবসায়ীর হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার
ওপেনএআই’র নতুন বাজি ‘কোডেক্স’
ওপেনএআই’র নতুন বাজি ‘কোডেক্স’
বহু কাজ এখনও বাকি, কীভাবে চালু হবে শিশু হাসপাতাল
বহু কাজ এখনও বাকি, কীভাবে চালু হবে শিশু হাসপাতাল
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে খেলতে পারবেন তো ইয়ামাল? 
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে খেলতে পারবেন তো ইয়ামাল? 
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের