‘আমাদের কাছে মে দিবস বইলা কিছু নাই। কাজ করলে পেটে খাওন পড়বো, সন্তানের মুখে খাবার জুটবো। না করলে নাই।’— বলছিলেন কাজের আশায় অপেক্ষমাণ যুব্ক শাহীন। তিনি রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বর গোল চত্বরে অন্যান্য শ্রমিকদের সঙ্গে দিন চুক্তিতে কাজের অপেক্ষা করছিলেন। শ্রমিকের ‘কর্মঘণ্টা’ এবং ‘ন্যায্য মজুরি’ এসব বিষয়ের সঙ্গেও খুব একটা পরিচয় নাই তার। শ্রমিকের অধিকার আদায়ের জন্য শিকাগো শহরে যে আন্দোলন হয়েছিল, সে বিষয়েও তেমন ধারণা নেই। তবে তিনি শুনেছেন বলে জানান।
সোমবার (১ মে) সকালে ‘মে দিবস’ উপলক্ষে কথা হয় শাহীনসহ আরও কিছু শ্রমিকের সঙ্গে। এই সরকারি ছুটির দিনেও তারা বেরিয়েছেন কাজের সন্ধানে। রাজধানীর মিরপুর এক নম্বরে গিয়ে দেখা গেছে, কাজের সন্ধানে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গা থেকে জড়ো হয়েছেন বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ। হাতে বেলচা, কোদাল, কুঠার, শাবল ও বড় হাতুড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছেন তারা। কাজের সন্ধানে অপেক্ষার প্রহর যেন তাদের শেষ হচ্ছে না। ভোরে বাসায় কিছু একটা মুখে দিয়ে কাজের সন্ধানে বেরিয়ে আসতে হয় তাদের। বাসা-বাড়িসহ বিভিন্ন কাজের জন্য যারা শ্রমিক খুঁজতে আসছেন, তাদের কাউকে দেখতে পেলেই সবাই দল বেঁধে ছুটছেন তার কাছে। দর কষাকষির পর মিলে গেলে যেতে পারছেন কাজে।
দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করা এসব শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দৈনিক ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে কাজ করে থাকেন তারা। সকাল থেকে কাজ করতে গিয়ে কখনও কখনও সন্ধ্যাও হয়ে যায়। ঘণ্টার কোনও হিসাব থাকে না। হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর যখন নির্ধারিত টাকাটি হাতে পান তখন কিছুটা শান্তি লাগলেও আগামী দিনের কথা ভেবে কিছুটা দুশ্চিন্তায় থাকেন এসব শ্রমিকরা। কাজের সন্ধানে আবারও দাঁড়াতে হবে আগামীকাল। আর এভাবেই বছরের পর বছর দৈনিক ভিত্তিতে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে যাচ্ছেন এসব নিম্ন আয়ের মানুষ।
দুই বছরের বেশি সময় ধরে রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বর গোল চত্বরে দৈনিক মজুরের ভিত্তিতে শ্রম দেওয়া জামিনুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রতিদিনই কাজের সন্ধানে আসতে হয়। শরীর খারাপ থাকলেও কিছু করার থাকে না। আমি মিরপুর ১১ নম্বর পল্লবী এলাকায় থাকি পরিবার এবং সন্তানদের নিয়ে। কোনোদিন কাজ মেলে, আবার কোনোদিন কাজ পাই না।’
কাজের জন্য অপেক্ষায় থাকা পঞ্চাশোর্ধ্ব রবিউল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা বাসা পরিবর্তন, বাসায় রঙ করা, কনস্ট্রাকশনের ইট বালি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ করে থাকি। সবাই কম টাকায় আমাদের নিতে চায়। যখন একেবারে কাজ থাকে না, তখন বাধ্য হয়েই কম টাকাতেই আমাদের যেতে হয়।’
সাত বছর ধরে দৈনিক ভিত্তিতে শ্রম দেওয়া ফুল মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের তো কাজের কোনও মূল্য নির্ধারণ করা নেই। যাদের সঙ্গে দর-দামে কুলোয় তাদের এখানে গিয়ে দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করি। সময় যত বাড়তে থাকে কাজ পাওয়া নিয়ে আমাদের শঙ্কা দেখা দেয়। কাজ পাবো কি পাবো না, সেজন্য সময় বাড়ার আগেই সবাই কাজ পাওয়ার আশায় থাকি। বাকিটা আল্লাহ ভরসা।’