স্বাভাবিকভাবেই চলছিল যমুনা টিভির নিউজরুম এডিটর কুদরত-ই খুদা হৃদয়ের দৈনন্দিন জীবন। সবার খোঁজ-খবর রাখা, নিয়মিত অফিসে যাওয়া—সবই চলছিল নিয়ম মতো। এসবের মধ্যেই খবর এলো তার অস্বাভাবিক মৃত্যুর।
মঙ্গলবার (৯ মে) দুপুরের দিকে রাজধানীর লেকসার্কাস রোডের ৯৫ নম্বর বাড়ির চিলেকোঠা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে কলাবাগান থানা পুলিশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বান্ধবীকে সঙ্গে নিয়ে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ওই ভবনের সাত তলায় চিলেকোঠা ভাড়া নিয়েছিলেন কুদরত-ই খুদা হৃদয়। ওই বাসায় তার বান্ধবীর (একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষবর্ষের শিক্ষার্থী) নিয়মিত যাতায়াত ছিল। বাসায় হৃদয়ের মাও আসতেন মাঝে মধ্যে। বাবা ইতালি প্রবাসী আরিফ হোসেন মিঠু দেশে ফেরার পর ওই মেয়ের সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। মেয়েটি হৃদয়ের মাকে মা বলেই ডাকতেন।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, কোনও কারণে হৃদয় আত্মহত্যা করতে পারে। তবে কী কারণে আত্মহত্যা করেছে সেটা স্পষ্টভাবে বলতে পারছে না পুলিশ। ঘটনার পর হৃদয়ের ওই বান্ধবীকে থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। ঘটনার দিন সকাল ৮টার পর ওই বান্ধবীই হৃদয়ের ফোন থেকে মা হোসনেয়ারা বেগমকে ছেলের মৃত্যুর খবর জানান।
পুলিশ মরদেহ উদ্ধারের পর গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জের হোসেনপুর থেকে হৃদয়ের মা ও স্বজনরা ঢাকায় কলাবাগান থানায় আসেন। থানায় আসেন হৃদয়ের কয়েকজন সহকর্মী এবং ওই বান্ধবী ও তার পরিবারের সদস্যরা।
লেক সার্কাস ৯৫ নম্বর বাসার দারোয়ান আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘স্ত্রী পরিচয়ে একজন মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারিতে আমাদের ভবনের চিলেকোঠা ভাড়া নিয়ে উঠেছিলেন হৃদয়। এর আগে পাশের তালুকদার ভিলায় থাকতো। মোটরসাইকেলে ওই বান্ধবীকে নিয়ে মাঝে মধ্যে অনেক রাতেও বের হতেন। ঘটনার দিন আমি ডিউটিতে ছিলাম না। হামিদ নামে আরেকজন দারোয়ান মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হৃদয়ের ওই বান্ধবীকে দেখতে পান। আসা-যাওয়ার মধ্যে ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করতেন তারা। মাঝে মধ্যে খুব সকালে বের হয়ে যেতেন। এ মাসে বাসাও ছেড়ে দিয়েছিলেন। এরমধ্যে তিনি এভাবে মারা গেলেন!
কলাবাগান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'ঘটনার পর তাদের সহকর্মীরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায়। আরও অনেককে ঘটনাস্থলে গিয়ে আমরা দেখতে পাই। পুলিশ যাওয়ার আগেই হৃদয়ের মরদেহ ঝুলন্ত অবস্থা থেকে নামিয়ে ফেলা হয়। খবর পেয়ে মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ৯৫ লেক সার্কাসের সাত তলা ভবনের ছাদের ওপরের একটি কক্ষ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় হৃদয় মৃত ও গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় ছিলেন।'
স্বজনদের বরাত দিয়ে ওসি সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, 'ছেলেটি যেকোনও ঘটনায় খুব আবেগপ্রবণ হয়ে যেতো। ঘটনার আগে মধ্যরাতে ওই বান্ধবীর সঙ্গে বিভিন্নভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করে। না পেয়ে ভোর ৪টায় মা হোসনেয়ারা বেগমকে ফোন করে দীর্ঘক্ষণ কথা বলে। ওই সময় তার বান্ধবীর কথা মায়ের সঙ্গে শেয়ার করে। মাকে বলেন ওই মেয়েকে ছেলের বউ হিসেবে ঘরে তোলার যে চিন্তা করছেন সেটা মাথা থেকে সরাতে।'
ওই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে অনেক সময় সে নিজেকে নিজেই আঘাত করতো। তার মা ও মামার সঙ্গে কথা বলে আমরা এমনটাই জানতে পেরেছি। এছাড়া যে মেয়েটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিল সেটা তার পরিবার জানতো। হৃদয়ের বাসায় ওই মেয়েটি যে যেতো সেটা তার মা জানতেন। ইতালি প্রবাসী হৃদয়ের বাবা দেশে ফেরার পর তাদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল।
এ বিষয়ে মৃত হৃদয়ের মামা ফেরদৌস হাসান বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছেন। মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনও বিষয় আছে কিনা সে বিষয়টিও আমরা খতিয়ে দেখছি।'
হৃদয়ের মামা এটিএন বাংলা টিভির সিরাজগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি ফেরদৌস হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'ভাগ্নের মৃত্যু নিয়ে আমাদের কিছু সন্দেহ হচ্ছে। মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যাবো বলে তৎক্ষণাৎ আমরা সেভাবে কোনও মামলা করিনি। অপমৃত্যুর যে মামলাটি হয়েছে আমরা যদি না করতাম তাহলে পুলিশ বাদী হয়ে নিজেই মামলা করতো। এ জন্য আমি নিজেই বাদী হয়ে অপমৃত্যুর মামলাটি করেছি। হৃদয়ের বাবা ইতালি থেকে শিগগিরই ফিরবে। তিনি এলে আমরা আরেকটি মামলা করবো। কিছু বিষয় আমাদের মাঝে সন্দেহ তৈরি করেছে।'
আরও খবর: