‘মনের কথা’ বলবেন কাকে?

সারাদিন চাকরি করে, বাসা সামলে যখন আপনি ক্লান্ত, কারোর সঙ্গেই কথা বলতে ইচ্ছে করে না। এমনকি সন্তানের যৌক্তিক প্রশ্নেও আপনি বিরক্ত হন। অফিসে আপনি কাজ করছেন ঠিকই, কিন্তু তা মনঃপূত হচ্ছে না নিজেরই। রাতে ঘুম হয় না। কার কাছে বলবেন— মনের মধ্যে কী চলছে? প্রচণ্ড মাথা ব্যাথা নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে তিনি বলেন, একটু সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে যেতে হবে। এতে আপনি তার ওপর চটে গিয়ে জানতে চাইলেন— আমি কেন পাগলের ডাক্তারের কাছে যাবো, আমি কি পাগল?

মনোরোগ বিশ্লেষকরা বলছেন, সাইকোলজিস্টরা কাউন্সিলিং করেন। কিন্তু এই সেবা এতটাই অপ্রতুল এবং কেন আপনি তাদের কাছে যাবেন, সেই বিষয়ে তেমন প্রচারণা না থাকায়, মনের চিকিৎসা এখনও জনপ্রিয় হয়নি। ‘সমস্যা’ চূড়ান্ত না হলে, কেউ আচরণে ‘পাগলামি’ না করলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার চল এ দেশে নেই বললেই চলে। একইসঙ্গে যারা আছেন, তাদের বিরুদ্ধেও আছে ‘নৈতিকতা’ লঙ্ঘনের নানা অভিযোগ। সব মিলিয়ে ‘বিশ্বাসযোগ্য’ মানুষের সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত কথা বলতে স্বস্তিও বোধ করেন না কেউ।

চিকিৎসকরা বলছেন, মনোরোগের ক্ষেত্রে দুই ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি আছে। একটি হলো সাইক্রিয়াটিস্ট, যারা কিনা চিকিৎসা শাস্ত্র পড়ে রোগীদের ওষুধ দিতে পারেন। আরেক ধরনের হলো, সাইকোলজিস্ট যারা কেবল কাউন্সিলিং করেন। সাইকোলজিস্টদের মধ্যে আবার বেশ কয়েক ধরনের ভাগ আছে। এসব ধরন মিলিয়ে মনোরোগের সেবা দিতে দেশে সাইক্রিয়াটিস্ট ও সাইকোলজিস্ট আছেন মোট সাড়ে আটশ’।

অনেক রোগী অভিযোগ করেন যে, সাইক্রিয়াটিস্টের সঙ্গে তারা আলাপ করতে যান, কিন্তু তিনি অন্যদের সঙ্গে তার (রোগীর) সমস্যার বিষয়ে আলাপ করেন। সেটা তাকে আরও বিপর্যয়ের মুখে ফেলেছে। এমন অভিযোগও আছে— চিকিৎসক মন দিয়ে কথা শোনেন না। এমনকি কথা শোনার সময় ধমকানও।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের দেওয়া তথ্যে বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ১২ দশমিক ৬ শতাংশ কোনও না কোনও মানসিক রোগে আক্রান্ত। তবে কুসংস্কার, অজ্ঞতা আর সুযোগ কম থাকায় মানসিক রোগীদের শতকরা ৯২ ভাগই থাকেন চিকিৎসাসেবার বাইরে। সারা দেশে মানসিক রোগের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য পর্যপ্ত সুযোগ- সুবিধা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে। কেন এই ঘাটতি জানতে চাইলে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক হেলাল উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাইক্রিয়াটিস্ট এখন বছরে ১০ থেকে ১৫ জন বের হন। মেডিক্যালে পড়ার পরেও অন্তত আরও পাঁচ বছর পড়ালেখা চালিয়ে যেতে হয়। ১০ বছর আগেও বছরে ২ থেকে ৩ জন সাইক্রিয়াটিস্ট পাওয়া যেতো। ফলে রাতারাতি এই সমস্যার সমাধান হবে না।’

মানসিক চিকিৎসা নিতে কাউন্সিলিংয়ে যাওয়া একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে কাউন্সিলরদের বিরুদ্ধে খারাপ ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে উচ্চশিক্ষায় প্রবাসী মনোচিকিৎসক মোহাম্মদ আসিফ বলেন, ‘আমাদের নৈতিকতার জায়গায় কাজ করার প্রয়োজন আছে। এটা ভীষণভাবে ভায়োলেশন।’ 

তিনি বলেন, ‘একজন মনোচিকিৎসকের মনে রাখা দরকার— তিনি পাদ্রি নন, বিচারক নন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নন। মানে তিনি কারও পাপপূণ্যের হিসাব করতে বসবেন না। কাউকে জাজ করবেন না, শাস্তি দেবেন না। বাস্তবতা হলো, রোগীর প্রাইভেসি নিয়ে ভাবার জায়গা তৈরি হয়নি।’

কারোর নিজের ব্যক্তিগত কথা বলে হালকা হতে চাইলে কোথায় যাবেন প্রশ্নে মনোরোগ চিকিৎসক আতিকুল হক বলেন, ‘এরজন্য সাইকোলজিস্টের কাছে আপনি যাবেন। এখন অনলাইনে এ রকম অনেক পাওয়া যায়, যারা সমসাময়িক নানা মেথড ব্যবহার করে কাউন্সিলিংয়ের কথা বলেন। কিন্তু এসব প্রক্রিয়া আপনার কষ্ট লাঘবে কার্যকর হবে না। আমাদের প্রচলিত মেথডে কাউন্সিলর ও ‘রোগীর’ মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। আগে এই দূরত্ব কমাতে হবে এবং তার মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে হবে। একইসঙ্গে আমাদের এখানে কারোর কাউন্সিলিং দরকার হলে, তিনি নিজে ও আশেপাশের মানুষ তাকে ‘পাগল’ ভাবে বা নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। সমাজের প্রচলিত এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে কাউন্সিলিং নিতে আসা মানুষকে অনেক বেশি সতর্কতার সঙ্গে হ্যান্ডেল করা দরকার।’

তিনি মনে করেন, চিকিৎসককেও স্ট্রেসমুক্ত একজন হতে হবে। কেননা, নিজের স্ট্রেস নিয়ে অন্যের স্ট্রেস কমানো সম্ভব না। একইসঙ্গে যারা আসেন চিকিৎসা নিতে, তাদের কোনও কথা একজন চিকিৎসক বা সাইকোলজিস্ট অন্য কারোর সঙ্গে শেয়ার করবেন না। প্রফেশনাল সিক্রেসি ভীষণ জরুরি।’