রাজধানীর শ্যামলীর ডিএনসিসি ওয়ান্ডারল্যান্ডের (শিশুমেলা) বিপরীতে ঝাঁ-চকচকে ২০ তলা ভবন রূপায়ন শেলফোর্ড। ভবনটিতে রয়েছে বেশ কয়েকটি হাসপাতাল ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়। বৃহস্পতিবার (১ জুন) দিবাগত মধ্যরাতে ভবনটিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এসময় হাসপাতালগুলোতে কয়েকশো রোগী ভর্তি ছিলেন। আগুন লাগার পর তাদের দ্রুত নামিয়ে আশপাশের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। খবর পেয়ে চলে আসে ফায়ার সার্ভিসও। তারা আসার পর ভবনটি থেকে ২৩ জনকে উদ্ধার করে নামিয়ে নিয়ে আসেন। আর প্রচণ্ড ধোঁয়ায় শ্বাস বন্ধ হয়ে একজন মারাও যান। ভবনের দোকান মালিকরা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, দ্রুত দমকলবাহিনী না আসলে অনেক প্রাণহানি ঘটে যেতে পারতো, ক্ষতিগ্রস্ত হতো বহু প্রতিষ্ঠান।
ফায়ার সার্ভিস বলছে, ভবনে ওয়াটার রিজার্ভার থাকলেও রিজার্ভ ট্যাংক থেকে কোনোরকম পানি উত্তোলনের পয়েন্ট ছিল না। যেসব পয়েন্ট পাওয়া গেছে সেগুলো সবগুলোই বিকল ছিল। শুধু ফায়ার এক্সটিংগুইশারগুলো ছাড়া অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার যেসব সরঞ্জাম থাকার কথা, তার কোনোটিই ছিল না।
বৃহস্পতিবার (১ জুন) রাত ১১টা ২৫ মিনিটের দিকে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। পরবর্তী সময়ে ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি ইউনিট প্রায় আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। রাত ২টা চার মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। ভবনটির সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৯ তলার ‘ডাটা সফট’ ও ‘নিপা ফার্মাসিটিক্যাল’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগুন লাগার পরপরই আগুনের শিখা দ্রুত ক্যাবল দিয়ে ওপরে উঠে যায়। পরে ১৯ তলায় ছড়িয়ে পড়ে। ১৯ তলা থেকে শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত গ্লাস ভেঙে সড়কে পড়তে দেখা গেছে।
শুক্রবার (২ জুন) দুপুরে শ্যামলীর ওই ভবনের সামনে গিয়ে দেখা যায়, ভবনটির ১৯ তলা ওপর থেকে জানালার কাঁচ ভেঙে ঝড়ঝড় করে নিচে পড়ছে। পুরো ভবন নিরাপত্তার জন্য চারদিকে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। নিচ তলার দুয়েকটি দোকান পরিষ্কার করতে দেখা গেলেও ভবনটি সব কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
করপোরেট অফিস ছাড়াও ভবনটিতে ‘আমার বাংলাদেশ হাসপাতাল’, ‘ইসলামিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার’, ‘ঢাকা ট্রমা সেন্টার অ্যান্ড স্পেশালিস্ট হসপিটাল’, ‘হাই কেয়ার অর্থোপিডিক্স অ্যান্ড জেনারেল হসপিটাল’সহ আরও কয়েকটি সেবা প্রতিষ্ঠানের অফিস রয়েছে। এসব হাসপাতালে অনেক রোগী ভর্তি ছিলেন। আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই লোকজনকে নিচে নামাতে পেরেছিল দমকলবাহিনী।
ভবনটির ব্যবস্থাপক মিনার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভবনটিতে শুধু নিচ তলায় বিভিন্ন মেডিক্যাল সার্জিক্যাল আইটেমের ২৫টি দোকান রয়েছে। দুই থেকে সাত তলা এবং ১০ তলায় চারটি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এছাড়াও ৪০টি বিভিন্ন করপোরেট বাণিজ্যিক অফিস রয়েছে।’
ভবনটির নিচতলার এক ব্যবসায়ী ‘লাইফ গার্ড সার্জিক্যাল হোম’- এর মালিক ওমর আলী বলেন, ‘আমাদের সব সার্জিক্যাল আইটেম, সবই দামি জিনিসপত্র। পানিতে ভিজে কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলো সরিয়ে নিচ্ছি। কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তবে খুব বেশি না। আগুন নেভাতে দেরি হলেই আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে যেতো।’
সময়মতো ফায়ার সার্ভিস না এলে বড় ক্ষতির মুখে পড়ে যেতে হতো জানিয়ে এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘শুধু নিচ তলায় দোকান উপরে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও কয়েকটি হাসপাতাল রয়েছে। শত শত মানুষ হাসপাতালে ভর্তি ছিল। তাদের কী উপায় হতো! আমি শুনেছি নিচ তলার শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লেগে উপরে উঠেছে।’
একই রকম কথা বলেন ভবনটির ১৮ তলার ইনফোক্র্যাট সল্যুশন লিমিটেড-এর এর কর্মচারী সৈকত পাল। তিনি বলেন, ‘লোকজনকে দ্রুত বের করে ফেলার কারণে বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে বাঁচা গেছে।’
এ প্রসঙ্গে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স এর পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মেনটেনেন্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আগুন লাগার বিষয়টি ধারণা করা হচ্ছে ডাকলাইন থেকে। ডাক লাইনে সাধারণত শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের ঘটনাগুলো হয়। নিচ তলা থেকে শুরু করে সব জায়গায় ছিল। কোথা থেকে আগুনের সূত্রপাত তা তদন্ত সাপেক্ষে বলা সম্ভব। তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। ডাকলাইনটি নিচতলা থেকে শুরু করে ২০ তলা পর্যন্ত বিস্তৃত। আমরা ভবনের ১৯ তলায় বেশি আগুন পেয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওয়াটার রিজার্ভার থাকলেও রিজার্ভ ট্যাংকি থেকে কোনোরকম পানি উত্তোলনের পয়েন্ট ছিল না। যেসব পয়েন্ট পাওয়া গেছে সেগুলো সবগুলোই ইন-অ্যাকটিভ ছিল। শুধু এক্সটিংগুইশারগুলো ছাড়া অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থার যেসব সরঞ্জামাদি থাকার কথা তার কোনোটি ছিল না, কাজ করেনি। সুউচ্চ এই ভবনটিতে সেফটি প্ল্যান ছিল কিনা এ বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে। আপাত দৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে সেফটি প্ল্যান থাকলেও সেগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি।’