পোকামাকড় মারতে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এক বাসায় পেস্ট কন্ট্রোল সার্ভিসের মাধ্যমে ওষুধ প্রয়োগের পর অসুস্থ হয়ে এক ব্যবসায়ীর দুই ছেলের মৃত্যু হয়েছে। ওই পরিবারের বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, সেই পেস্ট কন্ট্রোল কোম্পানি পোকামাকড় নিধনের জন্য অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড ট্যাবলেট (গ্যাস ট্যাবলেট) ব্যবহার করেছিল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীতে পেস্ট কন্ট্রোলের কাজগুলো যারা করেন তারা কোথাও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন। বাসায় গিয়ে কী স্প্রে করছেন আর কী মাত্রায় দিতে হবে তা তাদের জানা নেই। অফিস থেকে কেমিক্যালটি প্রস্তুত করে তাদের হাতে দেওয়া হয় স্প্রে করার জন্য।
পেস্ট কন্ট্রোল সেবাদানকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা সেবাগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান বা বাসাবাড়ির স্কয়ার ফিটের হিসাব করে লিকুইড বা পাউডার পাঠিয়ে থাকেন। কীভাবে কী করতে হবে শিখিয়ে দেওয়া হয়। তবে যারা কাজটি বাসায় গিয়ে করেন তাদের আনুষ্ঠানিক কোনও প্রশিক্ষণ নেই।
ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিয়ে পেস্ট কন্ট্রোল সেবা দেয় এমন অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ছায়া পেস্ট কন্ট্রোল সার্ভিস জানায়, তারা ওষুধ বিক্রি করে, বাসায় গিয়ে সেবা দেয় না। কী ধরনের ওষুধ কীভাবে ব্যবহার করতে হবে জানিয়ে দেয় ক্রেতাদের। তেলাপোকা মারার জন্য ককরোচ কিলার হিট পাউডার সারা বাড়িতে চার-পাঁচ দিন ছোট ছোট কাগজের ওপর ছড়িয়ে রাখতে হবে। এসব ওষুধ শিশুদের কাছ থেকে দূরে রাখতে হবে। এই ওষুধ ও তার মাত্রার বিষয়ে কীভাবে জানেন প্রশ্নে তারা বলেন, ওই ওষুধ চীন থেকে আনেন এবং বাসার আয়তন অনুযায়ী তারা ব্যবহারবিধি জানিয়ে দেন।
সব নির্ধারণ হয় অনলাইনে
কোথায় কী ওষুধ ব্যবহার করতে হবে—অনলাইনে শুনেই নির্ধারণ করা হয় বলে জানান সেবাদানকারীদের অনেকেই। বাসা কত বড়, কোন কোন ঘরে করাতে চান, নাকি পুরো বাসায়, কী পরিমাণ তেলাপোকা বা ছারপোকা আছে এসব প্রশ্নের ভিত্তিতেই সেবা দেওয়া হয়। কোনও দক্ষকর্মী সেবা দেওয়ার আগে বাসা পরিদর্শনে আসে না। ফলে মাত্রা কতটুকু হবে তাতে ভুল থেকে যেতেই পারে।
কেয়ার পেস্ট কন্ট্রোল সার্ভিসের নীলা বলেন, হয়তো দুর্ঘটনা যেখানে ঘটেছে সেই বাসায় যারা কাজ করেছেন তারা ওষুধের মাত্রার বিষয়ে জানেন না এবং কড়া ওষুধ ব্যবহার করেছেন। তেলাপোকার জন্য ফিউমিগেশন ট্যাবলেট ব্যবহার করা হয় না, এটা অত্যন্ত পাওয়ারফুল। অন্তত ৪৮ ঘণ্টা বাসার বাইরে থাকতে হবে এবং বাসায় প্রবেশের পরেও বেশ কিছু নিয়ম মানতে হবে।
বাগমারা ডটকমের রবিউল ইসলাম বলেন, অ্যামোনিয়াম ফসফাইট কোরিয়ার একটি ওষুধ। এটা এতই কড়া, আমরা সাধারণত ব্যবহার করি না। তেলাপোকা মারতে এর ব্যবহারের প্রবণতা কেমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বাসায় অনেক ছারপোকা হলে, পোকামাকড়ের আধিক্য থাকলেই কেবল দেওয়া হয়, কিন্তু এর মাত্রা নিয়ে খুব সতর্ক থাকতে হয়। যারা বাসায় স্প্রে করতে বা পেস্ট কন্ট্রোলের কাজ করতে যান তারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, তারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তাদের কে প্রশিক্ষণ দিয়েছে প্রশ্নে তিনি বলেন, খামারবাড়ি কীটনাশক বিভাগ থেকে প্রশিক্ষণ পাওয়া একজন আমার চার জন কর্মীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। অর্থাৎ সরাসরি আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ কেউ নেননি।
কী স্প্রে হচ্ছে বাসার মালিক জানেন না
সম্প্রতি বাসায় পেস্ট কন্ট্রোল করানো রায়হান হোসেন তার অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে বলেন, যিনি এসেছিলেন তাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম—যে লিকুইডটা স্প্রে করছেন সেটাতে কী আছে। তিনি জানান, এটা গোপন, অফিসের নিষেধ আছে। আমার বাসায় কী ওষুধ দেওয়া হবে সেইটা জানার অধিকার আমার আছে জানানো হলে একপর্যায়ে তিনি বলেন, এটা কীসের ওষুধ তা আমি নিজেও জানি না। আমরা যখন কাজে আসি অফিস থেকে এটা প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি করে দেওয়া হয়। পরে আমি আর তাকে স্প্রে করতে দিইনি।
অ্যালুমেনিয়াম ফসফাইটের কারণে কী ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে প্রশ্নে দেশের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও মেডিসিন বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, কী পরিমাণ ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করবে ক্ষতির ধরন কীরকম। তবে মাত্রা ঠিক না থাকলে এটা নাক, গলা, ফুসফুসকে আক্রান্ত করার পাশাপাশি কিডনি ও লিভারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই রাসায়নিক ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ফসফিন গ্যাস তৈরি করে। এর ফলে বমি ভাব, পেটে ব্যথা, হঠাৎ রক্তচাপ কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে এবং হৃদস্পন্দন কমে গিয়ে মানুষ মারাও যেতে পারে।
শিশুদের জন্য এই রাসায়নিকগুলো ভয়াবহ উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদা বেগম বলেন, বদ্ধঘরে অতিরিক্ত অ্যালোমেনিয়াম ফসফাইট দেওয়া হলে বিষক্রিয়া হয়ে যে ফসফাইন তৈরি হয় তা প্রাণঘাতী। শিশুদের জন্য তা মারাত্মক হতে পারে। ফলে এসব সেবা নেওয়ার আগে সতর্কতা অবলম্বন জরুরি।