বাংলাদেশের সীমিত সম্পদ ও সামর্থ্যের মধ্য থেকেই ইতিহাসের সর্বোচ্চ সাড়ে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবারের বাজেটে। তবে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকারকে দেশের অর্থনীতিতে কিছু সংশোধনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সচেষ্ট হতে হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও সমাজের বিশিষ্টজনেরা।
শনিবার (২৪ জুন) বনানীর ‘ঢাকা গ্যালারিতে’ এডিটরস গিল্ড আয়োজিত ‘বাজেট ও অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক গোল টেবিল বৈঠকে তারা এই মতামত দেন। গোল টেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন এডিটরস গিল্ড কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য রেজোয়ানুল হক।
পলিসি রিসার্চ-এর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘করোনার পর পৃথিবী একটা মন্দার দিকে যাচ্ছে, আমরা সেই মন্দার বাইরে থাকবো, তা ভাবা ঠিক না। কিন্তু বর্তমানে আমাদের আমদানি পরিস্থিতি ৫৪ শতাংশ নেগেটিভ, যা এর আগে এত কম কখনও ছিল না।’ তিনি বলেন, ‘আবার আমরা বলছি, আমাদের প্রবৃদ্ধি ২৩ থেকে ২৭ শতাংশ বাড়াতে। অথচ গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগ বাড়াতে পেরেছে ১ শতাংশ কোনোমতে। এ ছাড়া আমাদের ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট সিচুয়েশন, আমাদের ব্যালেন্স অব পেমেন্টসের যে সিচুয়েশন— আমরা সরকারিভাবে ঋণখেলাপি হইনি। কিন্তু বেসরকারিভাবে আমরা ঋণখেলাপি। সরকারিভাবে অনেক পেমেন্ট ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারদের দেওয়া হয়নি। আমাদের তেলের দাম দেওয়া হয়নি, গ্যাসের দাম দেওয়া হয়নি। এগুলো তো যুক্ত করতে হবে। এই সমস্যাগুলোকে নিয়ে একটা দেশ সাড়ে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি করবে, যেটা বাংলাদেশ কখনও পারেনি। সেটা অর্জন করে ফেলবে! এখন এখানে যদি সাড়ে ৫ শতাংশও হয়, তাহলে আমি বলবো চলবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অর্থনীতিবিদ ড. এম এম আকাশ বলেন, ‘আমাদের প্রবৃদ্ধিটা টেকসই না। এখানে আমাদের করণীয়— আমাদের কতগুলো বকেয়া সংশোধন, যেগুলো অনেক দিন ধরেই আমাদের করা উচিত ছিল। কিন্তু আমরা করিনি। এসব বকেয়া সংশোধনগুলোকে নিয়ে কাজ করা দরকার। একটা একটা করে যদি বলি— অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের সংশোধন, রাজস্ব ক্ষেত্রের সংশোধন, কর ফাঁকি দেওয়ার যে কালোটাকা, এটা কমাতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘ক্রেডিট কন্ট্রোল করার চেয়ে তা উৎপাদনশীল ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে কৃষি ও এসএমই। এই দুই জায়গায় ক্রেডিট পৌঁছে দেন। হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্টে ইনভেস্ট করেন। এগুলো এতদিন সংশোধন করেননি। আপনার প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিক মনিটরিং করেনি। রুলকে ইনফোর্সমেন্ট করেনি, শাস্তি দেননি। আর এটা এখনও কন্টিনিউ করবেন, আর সাড়ে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আশা করবেন, সেটা সম্ভব না।’
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, ‘গত ৯ মাস ধরে আমরা অনেক কিছু বলার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমাদের যে বক্তব্য, তা হয়তো পলিসি মেকারদের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয় না।’
বৈঠকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হাফিজ আহমেদ মজুমদার বলেন, ‘পৃথিবীর এমন কোনও বাজেট হয় নাই, যেখানে সমালোচনা ছিল না। এমনকি সিপিডি (সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ) বা বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদদের যদি বলি— বাজেট বানান, সেখানেও কত সমালোচনা থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘সেখানে বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা ও অর্থনীতি নিয়ে সরকার যে বাজেটে করে, তার অনেক সমস্যা আছে। কারণ, আমাদের প্রচুর পরিমাণের সম্পদ নেই। সীমিত সম্পদের মধ্যে আমাদের অ্যাডজাস্ট করতে হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার যে বাজেট করেছে, তাদের মতে বেস্ট ওয়ান। এর চেয়ে ভালো থাকলে তা তারা করতো।’
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘আইএমএফের পরামর্শে কোনও বাজেট হয়নি। বাজেট হয়েছে বাংলাদেশের প্রয়োজনে। বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে যে বাজেট হওয়া দরকার, সেটাই হয়েছে।’
বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (ভ্যাট) সাবেক কমিশনার মো. কাফি বলেন, ‘এনবিআরের (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) যে বর্তমান অবকাঠামো এবং তার যে বর্তমান স্ট্যান্ডার্ড বা ক্যাপাবিলিটি, সেটা দিয়ে আমার মনে হয় না— এবার বাজেটে যে পলিসি নেওয়া হয়েছে, তার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হওয়া সম্ভব। তাই বাজেট যেটা করার সেটা এরইমধ্যে হয়ে গেছে। আমি বলি, এখন এনবিআরের লোকদের যথেষ্ট মোটিভেট করা দরকার, প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার এবং এনবিআরকে অটোমেশন করা দরকার।’
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এর গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, ‘এনবিআরের লোকদের অটোমেশন এবং ডিজিটালাইজেশন করলে, এটা আমাদের কিছুটা হলেও সাহায্য করবে। পাশাপাশি আমাদের মূল্যস্ফীতির এ সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার যে বিষয়টি, তা খুব সাবধানে করা দরকার। বিনিময় হারটাকে ঠিক করে যদি সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্যটাকে একটা স্থিতিশীল অবস্থায় নিয়ে আসতে পারি, তাহলে রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রেও একটা ইতিবাচক বিষয় হবে।’
বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের যে সমস্যাগুলো আছে, সেগুলোকে মানতে হবে। তা সংশোধন করে এগিয়ে যেতে হবে।’
উল্লেখ্য, আগামী ২৬ জুন (সোমবার) সংসদে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট পাস হবে। এর আগে গত ১ জুন মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন।