দিল্লির মিউজিয়াম থেকে প্রদর্শনী তুলে নিয়ে বিতর্কে শহীদুল আলম

ভারতের একটি বিখ্যাত বেসরকারি মিউজিয়াম থেকে একেবারে শেষ মুহূর্তে আলোকচিত্র প্রদর্শনী প্রত্যাহার করে নিয়েছেন বাংলাদেশের সুপরিচিত আলোকচিত্রী ও অ্যাক্টিভিস্ট শহীদুল আলম। একটি ফেসবুক পোস্টে তিনি নিজের এই সিদ্ধান্তের কথা জানালেও কেন প্রদর্শনীটি বাতিল করেছেন, সে বিষয়ে কিছু জানাননি।

তবে ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকাকে শহীদুল আলম বলেছেন, ওই মিউজিয়ামটি যার নামে, সেই শিল্পপতি কিরণ নাদার যেভাবে ভারতের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর ‘প্রোপাগান্ডা মেশিনারি’র অংশ হিসেবে কাজ করছেন এবং তার সমালোচকদের বিরুদ্ধে যে ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছেন– তার প্রতিবাদ জানাতেই তিনি ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ভারতের কিরণ নাদার মিউজিয়াম অব আর্ট (কেএনএমএ), যাদের নয়ডা সেন্টারে শহীদুল আলমের এই প্রদর্শনীটি হওয়ার কথা ছিল; তারা এই সিদ্ধান্তে চরম হতাশ। আনুষ্ঠানিকভাবে কেএনএমএ কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনও বিবৃতি দেয়নি, তবে তাদের একজন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, প্রদর্শনী শুরু হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে শহীদুল আলম এভাবে সরে দাঁড়াবেন, সেটা তারা ভাবতেই পারেননি। 

তবে বিষয়টি নিয়ে কিরণ নাদারের সঙ্গে যে শহীদুল আলমের ই-মেইল চালাচালি হচ্ছিল, এ কথাও তিনি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে জানিয়েছেন।

কিরণ নাদার

বাংলাদেশের আলোকচিত্রী-অ্যাক্টিভিস্ট শহীদুল আলমের এই নাটকীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে ভারতের সোশ্যাল মিডিয়াতেও বেশ তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে। তার অনুগামী ও গুণগ্রাহীরা অনেকে যেমন তার ওই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করছেন, তেমনি অনেকেই আবার মনে করছেন ভারতের একটি নামী মিউজিয়াম থেকে নিজের প্রদর্শনী প্রত্যাহার করে তিনি শুধু নিজের নয়– বাংলাদেশেরও নাম ডুবিয়েছেন। 

শহীদুল আলমের যে প্রদর্শনীটি ঘিরে এই বিতর্ক, তার নাম ‘সিংড বাট নট বার্নট’ (ঝলসে গিয়েছে, কিন্তু পুড়ে যায়নি)।

এই মুহূর্তে শিকাগোর ‘রাইটউড৬৫৯’ গ্যালারিতে প্রদর্শনীটি চলছে, আর আগামী ১৭ জুলাই (সোমবার) সন্ধ্যা থেকে সেটি দিল্লির উপকণ্ঠে নয়ডাতে কিরণ নাদার মিউজিয়াম অব আর্টে শুরু হওয়ার কথা ছিল। এই প্রদর্শনীর কিউরেটরের ভূমিকায় ছিলেন ইনা পুরী।

প্রদর্শনীটি হওয়ার কথা ছিল নয়ডার এই মিউজিয়ামেই

কিরণ নাদার ভারতের সুপরিচিত শিল্প সংগ্রাহক ও সমাজসেবী। তিনি এইচসিএল টেকনোলজির প্রতিষ্ঠাতা ও ধনকুবের শিল্পপতি শিব নাদারের স্ত্রী। ভারতের বেসরকারি মিউজিয়ামগুলোর মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাত ‘কিরণ নাদার মিউজিয়াম অব আর্ট’। যার কর্ণধার নাদার।

সম্প্রতি রাজধানী দিল্লির ন্যাশনাল গ্যালারি অব মডার্ন আর্টে ‘জন শক্তি: আ কালেক্টিভ পাওয়ার’ নামে একটি প্রদর্শনীর আয়োজিত হয়েছিল, যার অন্যতম উপদেষ্টার ভূমিকায় ছিলেন কিরণ নাদার। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রতি মাসের শেষ রবিবার ‘মন কি বাত’ নামে যে রেডিও ভাষণ দিয়ে থাকেন, তার ১০০তম এপিসোডকে উদযাপন করতে ওই বক্তৃতামালায় তুলে ধরা বিভিন্ন বিষয়ের থিমে সাজানো হয়েছিল প্রদর্শনীটি। কিরণ নাদারের সমালোচকরা বলছেন, ওই প্রদর্শনীর সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে তিনি নিজেকে শাসকগোষ্ঠীর তাঁবেদার হিসেবে প্রমাণ করেছেন।

কেএনএমএ-তে ম্যানেজার পদে কর্মরত সন্দীপ কে লুইস নামে এক কর্মীও গত ১৫ মে সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট দিয়ে ওই প্রদর্শনী এবং তার সঙ্গে কিরণ নাদারের সংশ্লিষ্টতার প্রকাশ্য সমালোচনা করেছিলেন। এরপর কেএনএমএ কর্তৃপক্ষ তাকে বরখাস্ত করে; ভারতের বেশ কয়েকজন শিল্পী যার প্রতিবাদও জানিয়েছেন।

বিতর্কের সূত্রপাত নরেন্দ্র মোদির ‘মন কি বাত’ কেন্দ্রিক এক প্রদর্শনীতে কিরণ নাদারের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে

বাংলাদেশে থেকে শহীদুল আলম ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে যে বিবৃতি দিয়েছেন, তাতে কিরণ নাদারের নামাঙ্কিত মিউজিয়াম থেকে নিজের প্রদর্শনী তুলে নেওয়ার যুক্তি হিসেবে ওপরে উল্লিখিত এই দুটি কারণকেই তুলে ধরা হয়েছে।

তবে যে পর্যবেক্ষকরা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপর নজর রাখেন, তারা অনেকেই মনে করছেন দুই দেশের মানুষে-মানুষে সংযোগ (পিপল টু পিপল কনট্যাক্ট) এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে যে একটি সমৃদ্ধ পরম্পরা তৈরি হয়েছে– এই ঘটনা তাতে অবশ্যই বিরূপ প্রভাব ফেলবে। ভারতে কিরণ নাদারের ভূমিকা নিয়ে শহীদুল আলমের আপত্তি থাকলে তার এই প্রদর্শনীতে রাজি হওয়াই উচিত ছিল না, সে কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন তারা।