ভাড়াটিয়ার তথ্য না থাকায় অপরাধী শনাক্তে বেগ পেতে হয় পুলিশকে

ভাড়াটিয়া সেজে এক মাস ধরে অবস্থান করে আসছিল তারা। এরপর ঈদুল আজহার ছুটিতে বাড়িওয়ালার ঘরে ডাকাতি করে। লুটে নেয় টাকা ও স্বর্ণালংকার। এ ঘটনা রাজধানীর মধ্য বাড্ডার। মামলা দায়ের করা হলেও ওই ভাড়াটিয়াদের কোনও তথ্য না থাকায় তদন্তে বেগ পেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। এখনও জড়িতদের শনাক্ত যায়নি।

এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে এবং নির্বাচনকে সামনে রেখে অপতৎপরতা রোধে বাড়িওয়ালাকে তথ্য দেওয়ার জন্য ভাড়াটিয়াদের আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। নতুন ভাড়াটিয়ার তথ্য সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট থানা এলাকার বিট অফিসারের (থানার একজন এসআই দায়িত্বে থাকেন) কাছে জমা দিতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বাড়িওয়ালাদের।

অনেক সময় ভাড়াটিয়ারা তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। আবার বাড়িওয়ালাদের গাফিলতির কারণেও তথ্য পাওয়া যায় না। এসব কারণে তথ্য দিয়ে সহায়তা করার জন্য থানার পক্ষ থেকে বিভিন্ন বিট এলাকায় বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াদের নিয়ে পুলিশের তরফে উঠোন বৈঠক এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু রয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য বলছে, ২০২০ সালে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় ডাকাতির ঘটনা ঘটে ২১টি। চুরির ঘটনা এক হাজার ২১৭টি। ২০২১ সালে ডাকাতি ২৩ ও চুরির ঘটনা এক হাজার ৩৪৩টি। ২০২২ সালে ডাকাতি হয়েছে ২৭টি, চুরির এক হাজার ৬০৩টি। চলতি বছরের মে পর্যন্ত রাজধানীতে ডাকাতি হয়েছে ১৪টি ও চুরির ঘটনা ৬১০টি।

ডিএমপির তথ্য বলছে, চলতি মাসের ১ থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত ছিনতাই ও ডাকাতি চেষ্টার ঘটনায় রাজধানীতে গ্রেফতার করা হয়েছে ৫০৫ জনকে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ২০৮টি।

গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে রমনা বিভাগে ৪৬ জন, লালবাগ বিভাগে ৭৩, মতিঝিল বিভাগে ৪৪, ওয়ারী বিভাগে ২৭, তেজগাঁও বিভাগে ১৮৭, মিরপুর বিভাগে ৬৬, গুলশান বিভাগে ১১, উত্তরা বিভাগে ৫১ জন।

আর দায়ের করা মামলার মধ্যে রমনা বিভাগে ২৩টি, লালবাগ বিভাগে ৩৫টি, মতিঝিল বিভাগে ১৫টি, ওয়ারী বিভাগে ১৩টি, তেজগাঁও বিভাগে ৭৩টি, মিরপুর বিভাগে ৩২টি, গুলশান বিভাগে ৭টি, উত্তরা বিভাগে ১০টি।

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য বলছে, সারা দেশে বাসাবাড়িসহ বিভিন্ন জায়গায় ২০২১ সালে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে ৩০৮টি, ২০২২ সালে যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০৬টি। চলতি ২০২৩ সালের পাঁচ মাসে ৭৮টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতির মতো ঘটনা কিছুটা বেড়েছে। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান অভিযানে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার প্রক্রিয়া চলমান। তারপরও অপরাধীরা বাসাবাড়ি, গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন জায়গায় চুরি, ছিনতাই, ডাকাতির মতো ঘটনা ঘটাতে তৎপর। এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে নজরদারি এবং চলমান অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। এরইমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এসব বিষয় কঠোর মনিটরিং করছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতির মতো ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকার অভিযোগে যাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে—তাদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, ডাটাবেজ তৈরি হচ্ছে। কেউ অপরাধে জড়ালে কী ধরনের কাজে জড়িয়ে ছিল, কতবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ধরা পড়েছে– এসব বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে জানা সম্ভব হচ্ছে ডাটাবেজ থাকার কারণে। এ ডাটাবেজ প্রতিনিয়ত আপডেট করা হচ্ছে। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের ঠিকানা সংবলিত বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট থানাগুলোকে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বলা হচ্ছে।

রাজধানীর বেশ কয়েকজন বাড়িওয়ালার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাসা ভাড়া দেওয়ার পর ভাড়াটিয়াদের তথ্য ও জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি চাওয়া হয়। কিন্তু অনেকেই তথ্য দিতে গড়িমসি করে। আবার অনেকে তথ্য দেন। বিশেষ করে ব্যাচেলরদের মধ্যে অনেকে তথ্য দেবো, দিচ্ছি বলে সময় অতিবাহিত করেন।

ডিএমপির গুলশান বিভাগের ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল বাশার মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তাদের থানা এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করতে পেট্রোলিং, সেই সঙ্গে মামলা তদন্তের পাশাপাশি ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহ একটি চলমান প্রক্রিয়া। ভাড়াটিয়ার তথ্য থানায় জমা দিয়ে সহায়তা করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত বাড়িওয়ালাদের বলা হচ্ছে।’

ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের খিলগাঁও থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনির হোসেন মোল্লা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি চলমান রয়েছে। নতুন ভাড়াটিয়া এলে তাদের তথ্য সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট বিট অফিসারদের কাছে জমা দেওয়ার জন্য বাড়িওয়ালাদের প্রতিনিয়ত অবহিত করা হয়।’

উত্তরা বিভাগের উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী আবুল কালাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অনেক ভাড়াটিয়া বাড়িওয়ালাদের তথ্য দেয়, আবার অনেকে নিজ থেকে তথ্য দিতে চায় না। তথ্য দেওয়ার বিষয়ে ভাড়াটিয়ারা আন্তরিক হলে যেকোনও ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তা কার্যকর ভূমিকা রাখবে।’

ভাড়াটিয়ার তথ্য সংগ্রহ যেকোনও ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে সহায়ক হিসেবে কাজ করে উল্লেখ করে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন) এ কে এম হাফিজ আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহ করার বিষয়টি আরও গতিশীল করতে আগামী ‘ক্রাইম কনফারেন্সে’ সব ওসিকে নির্দেশনা দেওয়া হবে।