শক্তির ভরকেন্দ্র পশ্চিম থেকে পূর্বের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এ কারণে বৃহৎ শক্তি ও ছোট দেশগুলোর কাছে ইন্দো-প্যাসিফিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চীন ইস্যুতে বৃহৎ শক্তি ও ছোট দেশগুলোর মধ্যে বিভেদ আছে। ফলে ইন্দো-প্যাসিফিককে দুইভাবে বিবেচনা করে বৃহৎ শক্তি ও ছোট দেশগুলো।
সোমবার (২৮ আগস্ট) নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এআইপিজির অধ্যাপক মো. শহীদুল হক বলেন, ‘চীন, জাপান ও ভারতের উত্থানের কারণে শক্তির ভরকেন্দ্র পশ্চিম থেকে পূর্বে ঝুঁকে পড়ছে। কিন্তু কিছু দেশ পরিষ্কারভাবে চীনকে তাদের অন্তর্ভুক্ত মনে করে না। তবে, বাংলাদেশের মতো ছোট দেশগুলো এ ধারণা পোষণ করে না। এ কারণে ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে আলোচনায় ছোট দেশগুলো অনেক সময় অস্বস্তিবোধ করে।’
ইন্দো-প্যাসিফিকের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর প্রথম ১০টি সামরিক বাহিনীর মধ্যে সাতটি এ অঞ্চলে অবস্থিত। এছাড়া এখানকার ছয়টি দেশের কাছে পারমাণবিক বোমা আছে এবং সর্ববৃহৎ ৯টি সমুদ্রবন্দর এ অঞ্চলে অবস্থিত।’
মো. শহীদুল হক জানান, বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। এটি কতদিন বজায় রাখা সম্ভব হবে, সেটি ভবিষ্যৎ বলতে পারবে। তবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক সম্পর্ককে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু অর্থনৈতিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া এবং রাজনৈতিক সম্পর্ককে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিটের সচিব মো. খোরশেদ আলম বলেন, ‘ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। এ কারণে শুধু স্থলকেন্দ্রিক কৌশলগত পরিকল্পনার কলেবর বৃদ্ধি করে সমুদ্রকেন্দ্রিক কৌশলগত পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে।’
প্রতিটি দেশ তাদের জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশের ইন্দো-প্যাসিফিক আউটলুক অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং এখানে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে বলে তিনি জানান।
খোরশেদ আলম বলেন, ‘অতীতের অগ্রাধিকারকে এখানে খাটো করে দেখা হয়নি। বরং ইন্দো-প্যাসিফিকের প্রেক্ষাপটে অগ্রাধিকারগুলোকে বর্ণনা করা হয়েছে।’
তিনি জানান, আঞ্চলিক ভারসাম্য বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং চীন ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক বাংলাদেশকে প্রভাবিত করে। আমরা একটি পরিস্থিতিকে কতটুকু প্রভাবিত করতে পারবো, সেটি নির্ভর করবে আমাদের সক্ষমতার ওপর।
বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডার রাষ্ট্রদূত লিলি নিকলস বলেন, ‘কানাডা গত নভেম্বরে তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ঘোষণা করেছে এবং এটি একটি গেম-চেঞ্জার। এটি একটি অত্যন্ত বৃহৎ ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলপত্র।’
কানাডা ও বাংলাদেশের কৌশলপত্রে অনেক মিল আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ইন্দো-প্যাসিফিকের সঙ্গে দুই দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জড়িত।’
ইন্দো-প্যাসিফিক কী
ইন্দো-প্যাসিফিক বলতে সাধারণভাবে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলকে বোঝায়। ভৌগোলিকভাবে এই অঞ্চলটি কত বড়, সেটি ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে একাধিক দেশ।
সম্প্রতি প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের মার্কিন উপকূল থেকে শুরু করে গোটা ভারত মহাসাগর এর অন্তর্ভুক্ত।
২০১৭ সালে প্রকাশিত অস্ট্রেলিয়ার ফরেন পলিসি হোয়াইট পেপারে বলা হয়েছে—পূর্ব ভারত মহাসাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত হচ্ছে ইন্দো-প্যাসিফিক।
আবার ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের স্ট্র্যাটেজি অনুযায়ী, আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল থেকে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত ইন্দো-প্যাসিফিক।
সম্প্রতি কানাডার কৌশলপত্রে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ৪০টি দেশ আছে বলে উল্লেখ করা হয়।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার, ভৌগোলিকভাবে প্রতিটি দেশ বা অঞ্চলের ইন্দো-প্যাসিফিক মানচিত্রে বাংলাদেশের অবস্থান রয়েছে।