নির্বাচন সুষ্ঠু হলে আ. লীগ পাবে ১৪৮‑১৬৬ আসন, দাবি আবুল বারকাতের

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. আবুল বারকাত বলেছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পেতে পারে ১৪৮‑১৬৬ আসন, বিএনপি ১১৯‑১৩৭ এবং অন্যান্য দল ১৫টি আসন পেতে পারে।

বৃহস্পতিবার (২৬ অক্টোবর) এক সংবাদ সম্মেলনে তার গবেষণায় উঠে আসা এ তথ্য তুলে ধরেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সম্প্রতি ড. আবুল বারকাত ‘ভোটারের মন ও আসন্ন ২০২৪ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল’ শীর্ষক এক গবেষণা সম্পন্ন করেছেন। এ উপলক্ষে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি আয়োজিত একটি জাতীয় সেমিনার ও সংবাদ সম্মেলনে ড. বারকাত বলেন, ‘আসন্ন ২০২৪ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হলে—যেখানে সব দল, প্রার্থী ও ভোটারের জন্য নির্বাচনি মাঠ সমান সমতল হবে, তাহলে ৩০০ আসনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১৪৮‑১৬৬ আসন, বিএনপি ১১৯‑১৩৭, অন্যান্য দল ১৫টি আসন পেতে পারে।’

গবেষণায় উঠে আসা এসব তথ্য তুলে ধরে সমিতির সভাপতি আরও বলেন, ‘দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৫৫ আসনের ভাগ্য মোটামুটি নির্ধারিত। যেগুলো দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ‘ভিত্তি আসন’ বা ‘সম্ভাব্য বিজয়‑নিশ্চিত আসন’। এই ১৫৫ ভিত্তি আসনের মধ্যে ৭০ আসন পেতে পারে আওয়ামী লীগ, ৭০ আসন বিএনপি এবং বাকি ১৫ আসন জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, এলডিপি, বিজেপি পেতে পারে। তবে বড় দুই দলের মধ্যে যেকোনও দলকে সরকার গঠন করার জন্য প্রয়োজনীয় আর ৮১ আসন (এসবই ‘বিজয়‑অনিশ্চিত আসন’) পেতে হলে ‘দোদুল্যমান ভোটারদের’ ভোটের ওপর নির্ভর করতে হবে এবং যেকোনও আসনে জিততে হলে দোদুল্যমান ভোটারদের ৫৬ শতাংশ ভোট পেতে হবে। দোদুল্যমান ভোটারদের ভোট প্রদান সিদ্ধান্তে দ্রব্যমূল্য, মানব নিরাপত্তা, পদ্মা সেতু, ২০১৮ সালের নির্বাচন এবং স্যাংশন‑নিষেধাজ্ঞা‑প্যালেস্টাইনের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ ঘোষণা অবজেক্টিভ ফ্যাক্টর ও সংশ্লিষ্ট কাউন্টার‑ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে। একইসঙ্গে প্রভাবক হিসেবে আত্মীয়তা, বন্ধুবান্ধব, ঘনিষ্ঠজন, মুরুব্বিদের উপদেশ‑আদেশ‑নির্দেশ, পিতৃতান্ত্রিকতা (নারীর ক্ষেত্রে) সাবজেক্টিভ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে।’

অধ্যাপক বারকাত বলেন, ‘ভোটারের সম্ভাব্য দলীয় আনুগত্য অবস্থা, ভিত্তি ভোট (দলীয় অনুগত ভোটারের ভোট)-এর ধারণা, ভিত্তি আসন (সম্ভাব্য বিজয়-নিশ্চিত আসন)-এর ধারণা, বিজয়-অনিশ্চিত আসন-এর ধারণা, দোদুল্যমান ভোট, দোদুল্যমান ভোটারদের ভোট প্রদান সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনের ফ্যাক্টর-কাউন্টার ফ্যাক্টর এবং এসবের সম্ভাব্য প্রভাব ও গতিমুখ, ভোটারদের ভৌগোলিক অবস্থান বিভাজন (পদ্মা সেতুর প্রভাব অঞ্চল এবং তার বাইরের অঞ্চল) ব্যাখ্যা‑বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ খোলামেলা আলাপ‑আলোচনার ভিত্তিতে করা এই গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৫৫ বিজয়‑নিশ্চিত এবং ১৪৫ বিজয়‑অনিশ্চিত আসনের জয়‑পরাজয়ে ভূমিকা রাখবেন দোদুল্যমান ভোটাররা। তবে ভিত্তি আসন অর্থাৎ তুলনামূলকভাবে বিজয়-নিশ্চিত আসনে দোদুল্যমান ভোটারদের ভূমিকা থাকবে কম। অপরদিকে বিজয়‑অনিশ্চিত আসনের ভাগ্য নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা থাকবে দোদুল্যমান ভোটারদের। বিভিন্ন অনুসিদ্ধান্তভিত্তিক হিসাবপত্রে দেখা গেছে, দেশের ১৪৫ বিজয়-অনিশ্চিত আসনের মধ্যে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ৭৮‑৯৬ আসন এবং বিএনপি ৪৯‑৬৭ আসন পেতে পারে। পদ্মা সেতুর কারণে পদ্মা সেতু ভোট লভ্যাংশ হিসেবে দেশের দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের ২৩ বিজয়‑অনিশ্চিত আসনের সবকটিতে আওয়ামী লীগ এবং ঢাকাসহ দেশের পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর অঞ্চলের ১২২টি বিজয়-অনিশ্চিত আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৫৫-৭৩টি এবং বিএনপি ৪৯-৬৭টি আসন পেতে পারে।’

অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত বলেন, ‘সম্ভাব্য চূড়ান্ত ফলাফল বহাল থাকলে আওয়ামী লীগের পক্ষে জোটবদ্ধভাবে সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এক্ষেত্রে জোট হতে পারে জাতীয় পার্টির সঙ্গে। তবে আওয়ামী লীগের পক্ষে এককভাবেও সরকার গঠন সম্ভব হতে পারে, যদি তাদের আসন সংখ্যার গতিমুখ সর্বোচ্চ সম্ভাব্য-আসনমুখী হয় (অর্থাৎ সর্বনিম্ন ১৪৮ আসন থেকে সর্বোচ্চ ১৬৬ আসনমুখী হয়)। সম্ভাব্য চূড়ান্ত ফলাফল যদি বহাল থাকে, তাহলে বিএনপির পক্ষে এককভাবে সরকার গঠন সম্ভাবনা নেই। তবে বিএনপির পক্ষে জোটবদ্ধ সরকার গঠনের পাটিগাণিতিক সম্ভাবনা যতটুকু আছে, তা যথেষ্ট শর্তসাপেক্ষ। এক্ষেত্রে বিএনপিকে অবশ্যই সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন প্রাপ্তি (১৩৭টি আসন) নিশ্চিত করে জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য সবার সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে হবে এবং একইসঙ্গে আওয়ামী লীগের আসন সংখ্যা কোনও অবস্থাতেই সম্ভাব্য সর্বনিম্ন সংখ্যক (১৪৮ আসন) আসনের বেশি হতে পারবে না। এত বেশি শর্তসাপেক্ষ বিধায়, বিএনপির পক্ষে জোটবদ্ধ সরকার গঠনের বাস্তব সম্ভাবনা ক্ষীণ।’

অর্থনীতি সমিতির সভাপতি আরও বলেন, ‘প্রক্ষেপিত হিসাব কত দূর সঠিক-বেঠিক তা বুঝতে তিনটি বড় মাপের চালক—ভিত্তি ভোট, ভিত্তি আসন এবং দোদুল্যমান ভোটারদের ভোট প্রদান সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য কাঠামোর সম্ভাব্য মান যৌক্তিকভাবে পরিবর্তন করে দেখা গেছে, তাতে দলভিত্তিক আসন বণ্টনে এমন কোনও হেরফের হয় না, যাতে চূড়ান্ত উপসংহার পরিবর্তিত হতে পারে। সুতরাং, আসন্ন ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য আসন সংখ্যার যে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে, তা যথেষ্ট মাত্রায় সঠিক ও দৃঢ়-সবল এবং সম্ভাব্য নির্বাচনি ফলাফল সংশ্লিষ্ট গৃহীত পদ্ধতিতত্ত্ব যথেষ্ট বিজ্ঞানসম্মত।’