অবরোধের দিনগুলো কেমন যাচ্ছে টার্মিনালকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীদের

বিএনপি-জামায়াত ও সমমনা বিরোধী দলগুলোর দেওয়া টানা তিন দিনের অবরোধ কর্মসূচির তৃতীয় ও শেষ দিন ছিল বৃহস্পতিবার (২ নভেম্বর)।  আগামী রবি ও সোমবার (৫ ও ৬ নভেম্বর) ফের অবরোধ ডাকা হয়েছে। তবে এরইমধ্যে হরতাল-অবরোধের প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর। যারা ছোটখাটো ব্যবসা বা দৈনিক মজুরিভিত্তক কাজ করে জীবনযাপন করছেন তারাই এখন মূল ভুক্তভোগী। পরিবহন সেক্টরকে কেন্দ্র করে যারা বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট বা রেল স্টেশনে নির্দিষ্ট জায়গায় ব্যবসা বা কাজ করছেন তারা পড়েছেন বিপাকে। আয়-উপার্জন যেমন কমেছে তেমনি অনেকে গুণছেন লসের টাকা।

গাবতলী বাস টার্মিনালে এমন অনেক ব্যবসায়ী আছেন যাদের ব্যবসা শুধুই এই টার্মিনাল কেন্দ্রিক। যাত্রীদের আসা-যাওয়ার ওপর নির্ভর করেই চলেন তারা। যদি কোনও কারণে টার্মিনাল বন্ধ থাকে তখন তাদের ব্যবসাও বন্ধ হওয়ার জোগাড় হয়। এই মানুষগুলোর জন্য হরতাল-অবরোধ যেন অভিশাপ।

যান চলাচল না থাকায় লোক নেই গাবতলী টার্মিনালে, ফলে ভাসমান বা ছোটো দোকানগুলোর ব্যবসাও বন্ধ

বৃহস্পতিবার রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল সরেজমিনে ঘুরে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কীভাবে এক দিনের হরতাল ও এই তিন দিনের অবরোধ তাদের ওপর প্রভাব ফেলেছে।  তারা প্রত্যেকেই জানিয়েছেন, কেউ কম, কেউ বা বেশি, তবে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

গাবতলী বাস টার্মিনালের মুন্নি তিন্নি জেনারেল স্টোরের বিক্রেতা মো. হান্নান বলেন, অবরোধের এই তিন দিন বেচাকেনা একেবারেই কম। যেহেতু যাত্রী নাই, তাই বিক্রি কম। এখন কী আর করার আছে, মেনে নিতে হবে। এখন সান্ত্বনা নেই এই ভেবে যে আল্লাহ ফিলিস্তিনের থেকে আমাদের অনেক ভালো রেখেছে। তবে আমি বিশ্বাস করি খারাপ দিন সবসময় থাকে না, একদিন ভালো সময় আসবেই।

টার্মিনালের যাত্রীদের ওপর নির্ভর করেই যেহেতু এইসব ব্যবসায়ীরা টিকে আছেন তাই তারা প্রত্যাশা করেন যেন টার্মিনাল সব সময় যাত্রীতে ভরপুর থাকে।

টার্মিনালের যাত্রীদের ওপর ভরসা করেই চলে এই শ্রমজীবীদের জীবন

গাবতলী বাস টার্মিনালে ১০ বছর ধরে চৌকিতে করে কাপড় বিক্রি করেন মো. ইমাম হোসেন। তিনি বলেন, আমার সাধারণত প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজার টাকার বিক্রি হয়। কিন্তু এই অবরোধ হরতালে বিক্রি কমে গিয়েছে। অবরোধের প্রথম দুই দিন আমি ভয়ে দোকান নিয়ে বসি নাই। আবার যাত্রী নাই একারণেও বসি নাই। এই দুইদিন পুরাই লস গেল। এরকম কতদিন চলবে কে জানে! আজ সকাল থেকে এখন পর্যন্ত ৭০০ টাকা বিক্রি করতে পেরেছি। যাত্রী যদি বেশি থাকতো তাহলে বেচা বিক্রি বাড়ত।

ব্যবসায়ীদের অনেকেই ভাবছেন গত দুইদিনের ক্ষতি কিভাবে পুষিয়ে উঠবেন। আবার এটা ভেবেও কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছেন, যদি হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি চলতেই থাকে তখন তারা কী করবেন।

মালপত্র নিয়ে বসলে ভাড়া দিতে হয় বলে অবরোধের সময় বসেন না ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

টার্মিনালের ফল বিক্রেতা সাদ্দাম হোসেন বলেন, আমাদের ব্যবসাই হচ্ছে যাত্রীকেন্দ্রিক। যাত্রী আছে তো ব্যবসা আছে, যাত্রী নাই তো ব্যবসাও নাই। স্বাভাবিক সময়ে আমার প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার ফল বিক্রি হয়। কিন্তু আমি গত দুই দিন দোকান খুলিই নাই যাত্রী নাই বলে। আজ খুলেছি দুপুর ১২টার দিকে। বেলা আড়াইটা পর্যন্ত কোনও বেচাকেনা হয় নাই। গত দুই দিনের লস কীভাবে পোষাবো সেটা ভাবছি। আমার অল্প কিছু মাল্টা আর আঙুর ছিল গত দিনে সেগুলো নষ্ট হয়ে গেছে।

১৫ বছর ধরে গাবতলী বাস টার্মিনালে জুতা, স্যান্ডেল, বেল্ট বিক্রি করেন মো. আলী। তার প্রতিদিনের গড় বিক্রি ২ হাজার টাকা। আর যদি বড় কোও ছুটি থাকে তখন ৫ হাজার টাকা পর্যন্তও বিক্রি হয়। কিন্তু গত দুই দিনে তার এক টাকাও বিক্রি হয়নি। কারণ অবরোধে দুইদিন দোকান খুলতে পারেননি। আলী বলেন, আমার ব্যবসাই হচ্ছে এই বাস টার্মিনালকে  কেন্দ্র করে। বাইরে থেকে কোনও ক্রেতা এখানে এসে কেনে না। গাড়ি চললে আমার ব্যবসা থাকে, আর না হলে নাই। গত দুই দিন দোকান খুলি নাই। কারণ খুললেই ভাড়া দিতে হবে। যদি বেচতেই না পারি তাহলে ভাড়া দিবো কোথা থেকে?

অবরোধের সময় বাস ছাড়েনি গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে (ছবি: ফোকাস বাংলা)

তিনি আরও বলেন, আমার মতো মানুষের মোটামুটি দিনের টাকা দিয়ে দিনে খেতে হয়। কিছু টাকা জমিয়ে রাখি বিপদ আপদের জন্য। গত দুই দিন জমানো টাকা দিয়ে খেয়েছি। এখন অবরোধ যদি আরও বাড়ে তাহলে কীভাবে চলব জানি না।

তপন দাশ পেশায় একজন চর্মকার বা মুচি। তিনি গাবতলী বাস টার্মিনালে কাজ করেন প্রায় ১৫ বছর। এখানে তার প্রতিদিনের গড় আয় ৫০০ টাকা, যদি গাড়ি চলে ও যাত্রী থাকে। দেশে হরতাল-অবরোধের মতো ঘটনায় কষ্ট বাড়ে। তিনি বলেন, আমি তো টার্মিনালের ভেতরেই বসি। যাত্রী থাকলে কাজ পাই, আর না থাকলে পাই না। হরতাল-অবরোধের সময় আমার জন্য একটু কষ্ট  হয়ে যায়। কারণ ওই সময় যাত্রী থাকে না আমি কাজও পাই না। তখন আমি বিভিন্ন জায়গায় চলে যাই কাজের জন্য।  কাজ না করলে তো খেতে পারবো না।

ছবি: প্রতিবেদক।

আরও পড়ুন- ফিরে এলো হরতাল-অবরোধ, অর্থনীতির কী হবে?