বাস-ট্রেনে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যার ঘটনাসহ সাম্প্রতিক নাশকতার প্রতিবাদে ‘আমরাই বাংলাদেশ’ ব্যানারে পদযাত্রা করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, শিল্পী, সাহিত্যিক, ক্রীড়াবিদ, শ্রমিক, সাংবাদিক ও উদ্যোক্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। শনিবার (২৩ ডিসেম্বর) সকাল ১১টা ২০ মিনিটে পদযাত্রাটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শুরু হয়ে দোয়েল চত্বর, মৎস্য ভবন, ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট হয়ে শাহবাগে গিয়ে শেষ হয়। পদযাত্রা শুরুর আগে ‘নির্দেশনা’ নামে একটি পথনাটক পরিবেশন করে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন।
মিছিলে অংশগ্রহণকারী ‘ফাঁসি, ফাঁসি, ফাঁসি চাই, আগুন সন্ত্রাসীর ফাঁসি চাই‘,‘আগুন সন্ত্রাসের আস্তানা, ভেঙে দাও গুড়িয়ে দাও’, ‘আগুন সন্ত্রাসের ঠিকানা, এই বাংলায় হবে না‘— ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকেন।
‘আমরাই বাংলাদেশ’ ব্যানারে পদযাত্রায় সংহতি জানিয়ে অংশগ্রহণ করে ‘দেশের পক্ষে খেটে খাওয়া কৃষক সমাজ’, ‘ক্রীড়াসঙ্গ’, ‘বাংলাদেশ এডুকেশন রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম’, হিজড়াদের সংগঠন ‘হোপ অ্যান্ড পিস ওয়েলফেয়ার অরগানাইজেশন’, ‘সুস্থ জীবন’, ‘পদ্ম কুঁড়ি’ ‘হিজড়া সংঘ’, ‘সচেতন হিজড়া অধিকার যুব সংঘ’, ‘শান্তির নীড় হিজড়া সংঘ’, নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠন ‘আগুন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নারী উদ্যোক্তারা’, ‘আগুন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুব সমাজ’, ‘রিয়েল ফ্রেন্ডশিপ অ্যাসোসিয়েশন’, ‘জাতীয় ইমাম সমাজ’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা, ‘ব্যাংকার্স কমিউনিটি’, ‘ইনস্টিটিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ’, ‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’, ‘অগ্নিসন্ত্রাসের আর্তনাদ’, ‘বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা মঞ্চ’, ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় নীলদল’, ‘অগ্নিসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ নারী সমাজ’, ‘নিপীড়নবিরোধী বুদ্ধিস্ট কমিউনিটি’, ‘সংহিতাবিরোধী ক্রীড়াবিদ ফোরাম’, ‘বাংলাদেশ ওলামা মশায়েখ ও সুশীল সমাজ’, ‘সাম্রাজ্যবাদবিরোধী শিল্পী সমাজ‘সহ আরও বেশ কিছু সংগঠন।। এছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণির শিল্পীরাও এতে অংশ নেন।
পদযাত্রা শেষে শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে সমাবেশে প্রেসক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘আজ আমরা সমস্ত শ্রেণি-পেশার মানুষ এখানে একত্রিত হয়েছি, নাশকতাকে না বলার জন্য। আপনারা জানেন কীভাবে বাসে, ট্রেনে আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। আপনারা দেখেছেন ট্রেনে আগুন দিয়ে শিশুসহ মাকে হত্যা করা হয়েছে। এটি কোনও রাজনীতি হতে পারে না। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। আমরা আইনের আওতায় এনে অগ্নিসন্ত্রাসীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।’
সমাবেশে অংশ নিয়ে চিত্রনায়ক রিয়াজ বলেন, ‘এমন বাংলাদেশ আমরা কেউ চাই না। আজ যখন ট্রেনের ভেতর মায়ের কোলে শিশু আগুনে মারা যায়, তখন আমাদের বলতে হয়— এটা আসলে রাজনীতি নয়, অন্য কিছু। এই অন্য কিছু স্বাধীন বাংলাদেশে আর দেখতে চাই না। যথেষ্ঠ হয়েছে। ৩০ লাখ মানুষ তাদের বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে একটি পতাকা এনে দিয়েছেন। আর সেই বিজয়ের মাসেই যখন এমন নাশকতা হয়, সেটা মেনে নেওয়া যায় না। এই নাশকতা করে বাংলাদেশকে পিছিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত।’
চিত্রনায়িকা নিপুণ আক্তার বলেন, ‘আমরা নাশকতা চাই না। আমরা আমাদের সন্তান, জানমালের সুরক্ষা চাই। কিছুদিন আগে ট্রেনের মধ্যে এক মা তার সন্তানকে কোলে জড়িয়ে আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছেন। আমরা আসলে এরকম নাশকতা চাচ্ছি না।’
২০১৩ সালে শাহবাগে বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনায় হাত ঝলসে যাওয়া ভুক্তভোগী খোদেজা নাসরীন বলেন, ‘আমি ২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বর আমার কর্মস্থল থেকে যখন শাহবাগ এসে পৌঁছাই, তখন আমরা সব যাত্রী চিৎকার করছিলাম। আমার দুটি হাত ঝলসে গেছে। তারপর আমার এই দুই হাতে অসহ্য যন্ত্রণায় ভুগেছি বেশ কিছু দিন। আমরা সেই ২০১৩ সাল থেকে ২০২৩ পর্যন্ত এই অগ্নিসন্ত্রাসের সুপ্রিম হুকুমদাতাকে না বলি। এই অগ্নিসন্ত্রাসের হুকুমদাতাদের বিচার করতে হবে। আজকে অগ্নিসন্ত্রাসের জন্য আমরা দেখতে পাচ্ছি— আমার মায়ের বুকে পোড়া শিশু, রেললাইন কেটে মানুষ হত্যা। বিএনপি-জামায়াত হরতাল অবরোধের নামে যেই অগ্নিসন্ত্রাস ও নাশকতা করছে, তাকে না বলার সময় এসেছে।’
নারী উদ্যোক্তা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘আমরা শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ। আমরা সবসময়ই শান্তির পক্ষে। অগ্নিসন্ত্রাস সেই শান্তির বিরুদ্ধে। আর শান্তির বিরুদ্ধে মানে আমাদের বিরুদ্ধে। তাই আমরা প্রতিবাদ করতে একত্রিত হয়েছি। আর এই অগ্নিসন্ত্রাস, ভাংচুর আমাদের উদ্যোক্তাদের জন্যে আরও বেশি ক্ষতিকর। আমাদের পণ্যের সঙ্গে সঙ্গে লোকবলেরও প্রাণহানি ঘটে। যারফলে আমাদের ব্যবাসায় ক্ষতি হয়। আমরা শান্তি চাই, শান্তির পক্ষে তাই এখানে দাঁড়িয়েছি।’
‘অগ্নিসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ নারী সমাজ’ সংগঠনের ব্যানারে পদযাত্রায় অংশ নেওয়া মারিয়া বেগম বলেন, ‘২০০৯ সালের পর থেকে দেশ শান্তিপূর্ণভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল উন্নয়নের অগ্রযাত্রায়। সেই উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য ২০১৩ সাল থেকে একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য অগ্নিসন্ত্রাস শুরু করে। বারবার মানুষ পুড়িয়ে মেরে দেশকে অস্থিশীল করতে উঠে পড়ে লেগেছে। দেশ যখনই শান্তি বিরাজ করছিল, তারা আবারও তাদের হীনচরিত্র প্রকাশ করেছে। একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনকে তারা বাধাগ্রস্ত করতে আবারও সেই অগ্নিসন্ত্রাসের রূপ ধারণ করেছে। আমরা তাদের সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি এবং তাদের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করছি।‘
পুরান ঢাকার যুব সমাজের ব্যানারে অংশ নেওয়া একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তামিম মৃধা বলেন, ‘আমরা যুব সমাজ সব সময়ই শান্তিপূর্ণ দেশের পক্ষে, শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশের পক্ষে। আমরা চাই বাংলাদেশ সব সময় শান্তি বজায় থাকুক। অগ্নিসন্ত্রাস, হরতাল, অবরোধ, মানুষ হত্যা কখনও সঙ্কটে থেকে উত্তরণের পথ দেখাতে পারে না। আলোচনায় সমাধান হতে পারে। আমরা যুব সমাজ চাই আলোচনার করেই সঙ্কট সমাধান করা হোক। আর যেখানেই অগ্নিসন্ত্রাস আর অনিয়ম অশান্তি আমরা যুব সমাজ তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবো।’
পদযাত্রা শুরুর আগে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা নিহত নাহিদের মা রহিমা বেগম বলেন, ‘আমরা ছেলে বাসায় আসার পথে বাসে আগুন দেয়, সেখানে আমার ছেলে মারা যায়। কেন এই অগ্নিসন্ত্রাস? এই স্বাধীন দেশে কী আমাদের নিরাপদে পথ চলার অধিকার নাই? আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই!’