২০২৩ সালে আদালত অঙ্গনের চিত্র ছিল একেবারেই ভিন্নধর্মী। বছরের শুরুর দিকে মামলা দায়ের, খারিজ, গ্রেফতারি পরোয়ানা, কারাদণ্ড স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চলছিল। কিন্তু শেষের দিকে আদালত পাড়া বেশ সরগরম হয়ে ওঠে। ৭ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এ সময় রাজনীতির মাঠ ছিল উত্তপ্ত। সেই উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে আদালত অঙ্গনে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের আনাগোনা ব্যাপ কহারে বেড়ে যায়।
তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনার শীর্ষে ছিল দুর্নীতির মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমানের বিরুদ্ধে কারাদণ্ড, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসসহ হাজারো নেতাকর্মীকে গ্রেফতার, অভিযোগ গঠন ও পরোয়ানা জারির ঘটনা। এছাড়া বছরের শেষে এসে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অনেক মামলার রায়ে সাজার হিড়িক পড়ে যায়।
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সরকারের পদত্যাগের দাবিতে গত ২৮ জুলাই থেকে রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ২৩ হাজার ৪৭১ জন নেতাকর্মী গ্রেফতার ও ৯৮০টি মামলায় ৮৭ হাজার ১৪৩ জন আসামি করা হয়েছে বলে দাবি করেন দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এর মধ্যে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ শীর্ষ অনেক নেতা রয়েছেন। গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে আদালতে হাজির করা পর্যন্ত আদালত পাড়ায় ছিল রাজনীতির উত্তাপ।
তারেক-জোবায়দার কারাদণ্ড
গত ২ আগস্ট জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ ও তথ্য গোপনের মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ৯ বছর ও তার স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমানকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেন ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. আছাদুজ্জামান। এ মামলাকে ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে আদালত প্রাঙ্গণ। মামলার শুনানিতে বিএনপি ও আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের মধ্যে হট্টগোল ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।
বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের কারাদণ্ড
বছরের শুরু থেকে মাঝামাঝি পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অল্প কিছু মামলার রায় দেওয়া হয়। তবে বছরের শেষার্ধে এসে রায়ের হিড়িক পড়ে যায়। প্রায় প্রতিদিন একাধিক মামলার রায় হয়। আদালত সূত্রে এখন পর্যন্ত জানা যায়, প্রায় শতাধিক মামলায় বিএনপি-জামায়াতের দেড় হাজারের বেশি নেতাকর্মীর কারাদণ্ড হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন—বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব, দলটির ভাইস চেয়ারম্যান ও নোয়াখালী-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আলহাজ মো. শাহজাহান, কুষ্টিয়া-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আহসান হাবিব ওরফে লিংকন, বিএনপির গ্রাম সরকার বিষয়ক সহসম্পাদক মোহাম্মদ বেলাল আহমেদ, যুগ্ম সম্পাদক হাবিব উন নবী খান সোহেল, তথ্য বিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল, স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরফত আলী সপু, যুবদলের সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম নিরব, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রবিউল আলম প্রমুখ।
বিএনপির নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বিচার শুরু
চলতি বছরে প্রায় অর্ধশতাধিক নাশতকতার মামলায় বিএনপির পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত। নেতাকর্মীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, খায়রুল কবির খোকন, আমানউল্লাহ আমান, প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, সাইফুল আলম নিরব, শাহ আলম, হারুন উর রশীদ, হাবিবুর রহমান প্রমুখ।
গ্রেফতারি পরোয়না জারি
অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর কারাদণ্ডের পাশাপাশি গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিল বিএনপি নেতাকর্মীদের জন্য বেশ আতঙ্কের। নাশকতার মামলাগুলোতে অভিযোগ গঠন অথবা চার্জ গঠনের সময় বেশিরভাগ আসামি পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আদেশ দিয়েছেন আদালত। তাদের মধ্যে রয়েছেন—ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমান ও দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, রকত উল্লাহ বুলু, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, সাইফুল আলম নিরব, ইসহাক সরকারসহ প্রমুখ।
নাইকো দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়ার বিচার শুরু
গত ১৯ মার্চ নাইকো দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৯-এর বিচারক শেখ হাফিজুর রহমান। এরপর দ্রুততার সঙ্গে মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। নাইকো মামলায় রয়েল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশের দুই সদস্য ও এফবিআইয়ের কর্মকর্তা ঢাকার কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতে হাজির হয়ে সাক্ষ্য দেন।
আলোচিত ব্যক্তির মামলার রায়
ডিআইজি মিজানের দণ্ড: অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচার আইনের মামলায় গত ২১ জুন ডিআইজি মিজানুর রহমানকে পৃথক তিন ধারায় ১৪ বছর কারাদণ্ড দেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬ এর বিচারক মঞ্জুরুল ইমাম।
জিকে শামীমের দণ্ড: গত ১৭ জুলাই গুলশান থানার মানি লন্ডারিং আইনের মামলায় এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমের ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন ঢাকার ১০ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। তবে এই মামলায় তার সাত দেহরক্ষীকে দেওয়া হয় চার বছর করে কারাদণ্ড।
রিজেন্টের সাহেদের দণ্ড: গত ২১ আগস্ট রিজেন্ট হাসপাতাল লিমিটেডের চেয়ারম্যান সাহেদ করিমকে অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় ৩ বছরের কারাদণ্ড দেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৭-এর বিচারক প্রদীপ কুমার রায়।
এনু-রুপনের ৭ বছরের দণ্ড: গেণ্ডারিয়া থানার আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতা এনামুল হক এনু ও তার ভাই রুপন ভূঁইয়াকে অর্থপাচার মামলায় সাত বছর করে কারাদণ্ড দেন ঢাকার বিশেষ জজ-৮-এর বিচারক মো. বদরুল আলম ভূঞা। গত ২৮ নভেম্বর তাদের এ সাজার রায় আসে।
হেলেনা জাহাঙ্গীরের দণ্ড: গত ২০ মার্চ পল্লবী থানায় করা প্রতারণা ও চাঁদাবাজির মামলায় আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত নেত্রী হেলেনা জাহাঙ্গীরসহ ৫ জনকে দুই বছর করে কারাদণ্ড দেন ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তোফাজ্জল।