জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ বলেছেন, আমরা বর্তমানে যে পরিস্থিতিতে আছি, এখান থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের লেনিনকে জানার দরকার। নিজের থেকে বেরিয়ে আসতে পারে যারা, তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ রাখতে হবে।
শনিবার (২০ জানুয়ারি) বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রহমান মিলনায়তনে রুশ বিল্পবের স্থপতি লেনিনের জীবনভিত্তিক প্রথম বাংলা উপন্যাস ‘লেনিন’র প্রকাশনা উৎসবে এসব কথা বলেন তিনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ বলেন, প্রথমে এই রকম একটি বই লেখার জন্য আশানুর রহমানকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। লেনিন উপন্যাসটি এমন এক সময় প্রকাশিত হলো, যখন তার মৃত্যুবার্ষিকী। তার এই মৃত্যুকে অকাল মৃত্যু বলা যায়। তার এই মৃত্যুর শত বছর হচ্ছে আগামীকাল। কিন্তু এই উপন্যাসের মাধ্যমে লেনিন আমাদের কাছে অন্যভাবে উপস্থাপিত হলো। আর এই রকম ব্যক্তিকে নিয়ে উপন্যাস লেখা বিরাট সংগ্রাম ও সাহসের ব্যাপার।
সাংবাদিক নুরুল কবির বলেন, আমার এক শিক্ষক বলতেন পড়াশোনা শেষ হয়ে যাওয়ার পর যেটুকু মনে থাকে, তা-ই হলো শিক্ষা। আমার মতে ঐতিহাসিক উপন্যাস হলো, মূল চরিত্র একদিকে ইতিহাসের ভেতরে বেড়ে উঠেছেন, অন্যদিকে তিনি ইতিহাসকে প্রভাবিত করেছেন। এই দুটি দিক অবশ্যই থাকতে হবে। এখানে একজন এই উপন্যাসকে বস্তুনিষ্ঠ বলেছেন, কিন্তু আসলে বস্তুনিষ্ঠ হলে তো সেটি আর উপন্যাস থাকে না, উপন্যাসে থাকে নাটকীয়তা। উপন্যাসটি পড়ে আমার প্রথম মনে হয়েছে এটি তার মাকে নিয়ে উপন্যাস। আর উপন্যাসের সময় আরেকটু এগোতো পারে।
সাংবাদিক শামসুল আরেফিন বলেন, আমি সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়াশোনা করেছি, সেখানে থেকেছি। সোভিয়েতের সঙ্গে আমরা পরিচয় আছে। যে কারণে আমার জন্য অন্যতম ভালো লাগা এই উপন্যাস। লেনিনের মতো মনুমেন্টাল চরিত্রকে নিয়ে উপন্যাস লেখার সময় সচেতনভাবে ‘তিনি’ না বলে 'সে’ বলে সম্বোধন করেন। এখানে লেখক বোঝাতে চেয়েছেন লেনিনের প্রতি লেখকের টান যেন এখানে প্রকাশ না পায়। আমার কাছে লেখকের এই জিনিসটা ভালো লেগেছে। বইটিতে লেখক নৈতিকতার চাইতে প্র্যাক্টিক্যাল রাজনীতি গুরুত্ব দিয়েছেন। আমার লেনিন পঠন-পাঠনের জানা থেকে লেনিনকে যেমন প্র্যাক্টিক্যাল রাজনীতিবিদ মনে হয়েছে, এই উপন্যাসটিতে তেমনই মনে হয়েছে।
কবি ও কথাসাহিত্যিক মশিউল আলম বলেন, লেখক আশানুর রহমান এবং আমার সঙ্গে অনেক মিল রয়েছে। আমিও ব্যাংকার, সে-ও ব্যাংকার। আমারও প্রথম উপন্যাস ঐতিহাসিক উপন্যাস। লেখক বই নিয়ে কী করতে পারতেন বা করা উচিত তা নিয়ে আমি বলবো না। আমার মনে হয় লেখক লেখেন এবং লেখা তৈরি হয়ে যায়। এটি লেখকের স্বাধীনতা। আমাদের বর্তমান যে পরিস্থিতি, সবাই নিজ নিজ সুবিধা খুঁজে নেওয়া এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ যদি কেউ লেনিন উপন্যাসে খোঁজেন, তাহলে তিনি পাবেন না। এটা লেখকের স্বাধীনতা বলে আমি মনে করি। তিনি যেভাবে চেয়েছেন, সেভাবে উপস্থাপন করেন।
কথা প্রকাশের প্রকাশক জসিমউদদীন বলেন, কথা প্রকাশ মানুষের জ্ঞানচর্চার সহায়ক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে এবং করে যেতে চায়। পাঠকরা কথা প্রকাশের সঙ্গে না থাকলে তা এতদূর এগোতো পারতো না। আমরা আমাদের পাঠকের কাছে এই বই (লেনিন) তুলে ধরতে পেরে আমরা আনন্দিত। এই বইয়ে পাঠক অন্য এক লেনিনকে আবিষ্কার করবেন বলে আমার বিশ্বাস।
বইয়ের লেখক আশানুর রহমান বলেন, এটি আমার প্রথম উপন্যাস। আমার নিজের ওপর আস্থার ঘাটতির কারণেই এই বই প্রকাশ করতে ছয় বছর লাগে। আমাদের বাড়িতে ছোটবেলায় ছোটদের লেনিন বই পড়েছিলাম। সেখান থেকেই লেনিনের প্রতি আমার ভালো লাগা। এই উপন্যাসে আমি বিপ্লব পর্যন্তই নিয়েছি। এর পরের ঘটনা খুবই জটিল ও ঘটনাবহুল, যে কারণে আমি সেদিকে আগাইনি। এরপর অনেকে পরামর্শ দিয়েছেন দ্বিতীয় খণ্ডে হতে পারে সেটি। সে রকমও একটা পরিকল্পনা হতে পারে। আমি এখনও সে বিষয়ে কিছু ভাবিনি। আপাতত বইটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলতে থাকুক।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যের আগে সবাই মিলে উপন্যাসটির মোড়ক উন্মোচন করেন। এ সয়ম আরও বক্তব্য দেন কবি ও সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফ, অনুবাদ কথাসাহিত্যিক আফসানা বেগম।